সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এলে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন চেয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য রোববার জরুরি অধিবেশনে বসার ঘোষণা দিয়েছে মিসরের পার্লামেন্ট। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরার।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) মিসরের সামরিক একাডেমির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিসি বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন পরিস্থিতি মিসর মেনে নেবে না। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশটির সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কায়রো প্রস্তুত রয়েছে।
সিসি বলেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মিসরের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। এ কারণে তিনি জরুরি অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে রিয়াদের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়া হলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন পেতে পারে।
তবে মিসরের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর এ অবস্থানের উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা বা আক্রমণ চালানো নয়; বরং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে সৌদি আরব। দেশটির সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এর আগে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ায় দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই আবারও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিরা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাদের হামলার পেছনে ইরানের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তবে তেহরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। সংঘাতের বিস্তার এবং এর সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে মিসরের উদ্বেগের সঙ্গে লোহিত সাগরে নৌ চলাচল এবং সুয়েজ খালকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সুয়েজ খাল মিসরের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি প্রধান উৎস। লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে মিসরের অর্থনীতিতেও।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কায়রো সফরে গিয়ে সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়। মিসরের প্রেসিডেন্সির ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করে কায়রো।
মিসর ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো কায়রোকে বিপুল আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত দিয়ে সহযোগিতা করে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দিয়েছিল মিসর। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কায়রোর অবস্থানের কূটনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব রয়েছে।
মিসরের পার্লামেন্টের সাধারণ সম্পাদকালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। অধিবেশনে সৌদি আরবকে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সহায়তার অনুরোধ আসে কি না এবং মিসরের পার্লামেন্ট সম্ভাব্য পদক্ষেপের অনুমোদন দেয় কি না, তা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপাতত কায়রোর ঘোষণায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
The post সৌদিকে রক্ষায় সামরিক সহায়তার উদ্যোগ সিসির, পার্লামেন্টের অনুমোদন চাইল মিসর appeared first on ভোরের চেতনা.
