ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ ২৩ বছরের ঘটনাবহুল অধ্যায় পেরিয়ে
মুঃ শফিকুল ইসলাম
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ ২৩ বছরের ঘটনাবহুল অধ্যায় পেরিয়ে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেই সামরিক উপস্থিতির অবসানের নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে ইরাক। এ প্রত্যাহার একদিকে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তার শূন্যতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কাও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে এ ঘটনাকে নিছক সামরিক প্রত্যাহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি ইরাকের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের মধ্যে গৃহীত সমঝোতার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। তবে বিদেশী সেনা প্রত্যাহার মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের সব ধরনের সম্পর্কের অবসান নয়। সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইরাকের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বজায় রাখা।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করা। আইএসের সাংগঠনিক শক্তি আগের তুলনায় দুর্বল হলেও তাদের অবশিষ্ট সদস্য, গোপন নেটওয়ার্ক ও বিচ্ছিন্ন হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় নি। অতীতে ইরাকী বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আইএসের দ্রুত বিস্তারের অভিজ্ঞতা দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর ইরাকী নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজস্ব সক্ষমতায় এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এত দিন ইরানে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর এ ভারসাম্যে পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ইরানের প্রভাব বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃঢ়তা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। ইরাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো বিদেশী শক্তির প্রভাবের অধীন না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি কেবল বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর তার কার্যকর কর্তৃত্ব থাকে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যেন রাষ্ট্রের অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক তৎপরতা পরিচালনা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারত্ব এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারকে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ বিভাজন কোনো বিদেশী শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি না করে।
অন্যদিকে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ হিসেবে দেখাও সমীচীন নয়। সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রেখে ইরাক অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। বিশেষত জ্বালানি, কৃষি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তেলনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ ইরাকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরাকের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটি একদিকে ইরান, অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে পড়া ইরাকের জন্য নতুন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই দেশটির উচিত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নিজের ভূখণ্ডকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে না দেয়া। ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এ নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ যুদ্ধ ও সংঘাতের পর ইরাকের জনগণের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো মোকাবিলা না করলে শুধু সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা দিয়ে স্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা অর্জন, কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য শান্তিপূর্ণভাবে নিরসনের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার দেশটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটি যেমন বিদেশী সামরিক উপস্থিতির অবসানের মধ্য দিয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নিজস্ব নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণের দায়িত্বও বাড়িয়েছে। এ পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে ইরাক কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিরাপত্তা শূন্যতা মোকাবিলা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তার ওপর। বিদেশী সেনাদের বিদায়কে প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করতে হলে ইরাককে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও জনগণনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাই হবে দীর্ঘ সংঘাতের পর ইরাকের সামনে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
