বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলন ভারতের বর্তমান আন্দোলনকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রভাবকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ তার মন্তব্যের সমালোচনা করে তুলে ধরছেন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
এরই মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি দাবি করেছে, নেহা বোরার মন্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে বিরোধীরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে চায়।
বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি বলেই বসেছেন, নেহার এই বক্তব্য ভারতের ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর পরিকল্পনার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।
নেহাকে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক বলয়ের একজন সদস্য বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার দাবি, রাহুল ও তার রাজনৈতিক বলয় কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে চায় না; বরং তাদের লক্ষ্য ভারতে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো।
তিনি আরো দাবি করেন, কংগ্রেসের সামগ্রিক কর্মকৌশল ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা এবং বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার অনুরূপ শাসন পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
নেহা বোরার বক্তব্য ঘিরে বিজেপির অবস্থান মূলত এটাই। দলটি তার মন্তব্যকে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে এবং এর সঙ্গে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করছে।
তবে বোরার বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশে আলোচনার ধরন কিছুটা ভিন্ন। তার মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন মহলে চলছে নানা বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। এসব আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন—নেহা বোরা কি ডানপন্থি, না বামপন্থি অবস্থান থেকে বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন?
ডানপন্থি মতাদর্শের অনুসারীদের একাংশ মনে করছেন, বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের সাফল্য ও প্রভাব থেকেই বোরা অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
তাদের দাবি, জুলাই আন্দোলনে ডানপন্থি রাজনীতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এ কারণে বোরার বক্তব্যকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করতে তাদের আপত্তি নেই।
অন্যদিকে, বামপন্থিদের একাংশ মনে করেন, বোরার বক্তব্য ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গে বামপন্থি আদর্শেরও সামঞ্জস্য রয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের আন্দোলনকে ঘিরে বোরার বক্তব্যকে কেবল ডানপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়; বরং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নেহা বোরার বক্তব্য ডানপন্থি না বামপন্থি, বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর একটি ফেসবুক পোস্টে। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের কমরেডদের লাল সালাম জানিয়ে নেহা বলেছেন, বাংলাদেশের জেন-জি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার যে লড়াই করেছিলেন, তা ভারতের প্রতিবাদীদের অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু কমরেড নেহা তো শুধু এটুকুই বলেননি। বাংলাদেশের কমরেডরা যেমন মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, ভারতেও তাদের লড়াই মৌলবাদের বিরুদ্ধে।
ভাদুড়ী নেহার বক্তব্য তুলে ধরে আরো লেখেন, বাংলাদেশের মতো ভারতেও মুক্তচিন্তার ওপর আক্রমণ হচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশের বন্ধুদের একাংশকে দেখলাম, নেহার বক্তব্যের একটি অংশ তুলে ধরতে। নেহা যাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, তাদের রাজনীতি কী, সেটাও হয়তো অনেকে অনিচ্ছাকৃতভাবেই মিস করে যাচ্ছেন। তাই আরেকবার লিখছি, কমরেড নেহা ভারতের বামপন্থি ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক। তিনি বাংলাদেশের বামপন্থি ছাত্রছাত্রীদের সম্মেলনে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনকারীদের লাল সালাম জানানোর পাশাপাশি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দুই দেশের সংগ্রামী ঐক্যের কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে ডানপন্থি ও বামপন্থি বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র ও লক্ষ্য। এক পক্ষের মতে, জুলাই ছিল বৈষম্যবিরোধী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের লড়াই; অন্যদিকে, নেহা বোরার বক্তব্যে মৌলবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রসঙ্গ আসায় তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কোনো একটি মতাদর্শের গণ্ডিতে জুলাইকে সীমাবদ্ধ করলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য খর্ব হয়। কারণ, এই গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন শ্রেণি, মত ও রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ফলে জুলাইয়ের পরিচয় নির্ধারণে অংশগ্রহণকারীদের বিচ্ছিন্ন আদর্শের চেয়ে আন্দোলনের মূল দাবি, জনগণের অধিকার এবং কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আলোচনা যদি ডান ও বামপন্থার বিতর্কে আটকে থাকত, তাহলে বিষয়টি হয়তো এখানেই শেষ হতো। তবে আলোচনা এখানেই শেষ হয়নি। মূল আলোচনা শুরু হয় বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে। কেননা, বোরার বক্তব্যে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের কমরেডরা যেমন মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, ভারতেও তাদের লড়াই মৌলবাদের বিরুদ্ধে।
মূলত তার এই বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়।
নেহার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অনেকে ফেসবুকে লিখেছেন, বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন কোনো ধর্মীয় বা মৌলবাদের বিরুদ্ধে ঘটেনি। এটি ছিল ফ্যাসিবাদী বা আধিপত্যবাদ দূর করার আন্দোলন। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে নয়; এটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। জুলাই ছিল সব পন্থার মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি গণ-আন্দোলন। এর কোনো ধর্মীয় রূপ নেই।
জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে— নেহার এমন বক্তব্য নাকচ করেছেন তারা। নেহা বোরার বক্তব্যের সমালোচনা করে কবি ব্রাত্য রাইসু লিখেছেন, বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলন সম্পর্কে নেহা বোরার ধারণাটা যে ভুল, তা কেউ ওনাকে জানাইতে পারেন। এখানে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ফাইট করছে নাকি জেন-জিরা? কবে? বরং ওদেরই তো বেশির ভাগ ধর্মীয় মৌলবাদী। তবে ভুল ধারণা থিকা সঠিক আন্দোলন তৈরি হইতে পারে। আর নেহা বোরাদের আন্দোলনও তো ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে না। ভোটাধিকারের পক্ষের আন্দোলন। এবং এইটা অবশ্যই জরুরি আন্দোলন। সে কারণেই ভুল ধারণা থাকা অনুচিত।
অর্থাৎ, নেহা বোরার বক্তব্যকে ঘিরে আলোচনা কেবল ডানপন্থা ও বামপন্থার বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে বাংলাদেশ ও ভারতের আন্দোলনের প্রকৃতি, লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রশ্ন।
দুই দেশের মানুষ আসলে কাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, তাদের আন্দোলনের মূল দাবি কী এবং সেই আন্দোলনকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটিই এখন বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে যে ধারণা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লব নিয়ে দার্শনিক মিশেল ফুকোর লেখা কলামগুলোতে। ফুকোর দৃষ্টিতে, ইরানের আন্দোলন কেবল একজন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল না; এর গভীরে ছিল পশ্চিমা আধুনিকতার চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা।
তবে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। যে বিপ্লবে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী অংশ নিয়েছিল, তার পরিণতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মীয় কর্তৃত্বকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ফলে ইরানি বিপ্লবের মধ্যে ফুকো যে প্রতিরোধের সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তার ভবিষ্যৎ পরিণতি তার প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।
ফুকোর সেই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোনো কোনো বিশ্লেষকও প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের আন্দোলনের সূচনায় ছিল বৈষম্য, স্বৈরাচারী শাসন ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার অবসানের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা যেন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়ে উঠেছে লড়াইয়ের ‘আইকন’
এদিকে নেহা বোরার বক্তব্যকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখছেন গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তিনি বলেন, ভারতের লড়াকু নারী, প্রতিবাদী কণ্ঠ নেহা বোরার বক্তব্যকে কেবল ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বয়ানে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা এবং বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য—উভয়কেই খণ্ডিতভাবে দেখা হয়। জুলাইকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে হলে একে কোনো একক মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে জনগণের মুক্তি, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বুঝতে হবে। এই বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্যের নিরিখেই নেহা বোরার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত দর্শন ও প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কিংবা একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়। এর সূচনা হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে। কিন্তু তরুণদের আত্মত্যাগ, রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের মুখে তাদের অবিচল সাহস এবং জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলনটিকে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ও রাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের গণদাবিতে পরিণত করেছিল। তাৎক্ষণিক দাবির সীমানা অতিক্রম করে এই অভ্যুত্থান হয়ে উঠেছিল অন্যায়, নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ বলে জানান তিনি।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তরুণ ও শিক্ষার্থীদের অসাধারণ সাহসিকতা। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে রাজপথে দাঁড়িয়ে তারা প্রমাণ করেছেন, রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে, কিন্তু জনগণের ন্যায়সংগত আকাঙ্ক্ষাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চিরকাল দমন করা যায় না। তাদের আত্মত্যাগ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের পথ তৈরি করেনি; ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধী শক্তিকেও জাগিয়ে তুলেছে। তারা দেখিয়েছেন, ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে জনগণ কেবল রাষ্ট্রের শাসিত প্রজা নয়, পরিবর্তনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিও।
তিনি বলেন, এই জায়গাটিই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তাৎপর্যকে বাংলাদেশের সীমানার বাইরে নিয়ে যায়। ভারতের তরুণ নেত্রী নেহা বোরা বাংলাদেশের তরুণদের সাহস ও আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন। এটি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের জন্য গৌরবের বিষয়। কারণ, একটি দেশের তরুণদের আত্মত্যাগ যখন অন্য দেশের তরুণদেরও সাহস জোগায়, তখন সেই সংগ্রাম আর কেবল জাতীয় ইতিহাসের অংশ থাকে না; তা হয়ে ওঠে অন্যায় ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মানুষের বৃহত্তর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার অনুপ্রেরণা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেশে দেশে লড়াইয়ের ‘আইকন’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
একটি সরকারের পতন মানেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা নয়—বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেলেও প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোগত রূপান্তর। জনগণের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কেবল শাসকের পরিবর্তনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের ঐতিহাসিক শিক্ষা এখানেই—ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, শুধু সেই প্রশ্ন নয়; ক্ষমতা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তরুণদের আত্মত্যাগ ভারতের মতো অন্য দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তবে সেই অনুপ্রেরণার সার্থকতা নির্ভর করবে জনগণের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর।
তিনি আরো বলেন, নেহা বোরার বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই— একে শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শিক্ষা আড়াল হয়ে যেতে পারে। কোনো আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারিত হয় শুধু তার অংশগ্রহণকারীদের বিচ্ছিন্ন মতাদর্শ কিংবা কোনো একটি সামাজিক প্রবণতা দিয়ে নয়; বরং তার প্রধান দাবি, সম্মিলিত রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং যে ক্ষমতাকাঠামোকে সে চ্যালেঞ্জ করে, সেগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। জুলাইয়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন, কর্তৃত্ববাদ এবং জনগণের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে উদ্বেগের আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে এই গণ-অভ্যুত্থানের সামগ্রিক চরিত্র ব্যাখ্যা করা যায় না।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাইজিংবিডিকে বলেন, এখানে আরো একটি মৌলিক বিষয় রয়েছে। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে পারে, অথচ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ববাদ, নাগরিকের অসহায়ত্ব এবং জনগণের ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে। তাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে কেবল কে ক্ষমতায় থাকল, তার ওপর নয়; বরং ক্ষমতার উৎস, কাঠামো ও প্রয়োগের পদ্ধতি কতটা গণতান্ত্রিকভাবে রূপান্তরিত হলো, তার ওপর।
তিনি বরেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অর্থ হলো— জনগণের সার্বভৌমত্বকে কার্যকর করা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীভবন রোধ করা। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া শুধু শাসকের পরিবর্তন জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণতা দিতে পারে না।
তিনি বাংলাদেশের তরুণদের প্রশংসা করে বলেন, আমাদের তরুণদের সাহস ও আত্মত্যাগ আজ জাতীয় গৌরব। একই সঙ্গে তা অন্য দেশের তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। তবে এই অনুপ্রেরণার সর্বোচ্চ সার্থকতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বিজয়ে নয়; বরং জনগণের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মধ্যে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক শিক্ষা হলো—শুধু শাসকের পতন নয়, শাসনের কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের অবসানই জনগণের মুক্তির পূর্বশর্ত। আর সেই মুক্তির পূর্ণতা আসে তখনই, যখন জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং রাষ্ট্র জনগণের কাছে জবাবদিহির অধীন হয়। এই উপলব্ধিই বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং জনগণের মুক্তি ও রাষ্ট্র রূপান্তরের সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করে। এই চেতনায় ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনও নতুন দিশা খুঁজে পেতে পারে। জনগণের সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেহা বোরার লড়াই তখন আর একক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠবে মুক্তিকামী মানুষের বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ। শাসকের পরিবর্তন নয়, শাসনের চরিত্রের পরিবর্তন—এই ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হলেই জনগণের মুক্তির পথ উন্মুক্ত হবে, আর নেহা বোরার লড়াইও তার গভীরতর তাৎপর্য খুঁজে পাবে বলে মনে করেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
