‘সকাল সাতটার দিকে বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শুনে বাড়ি থেকে ছুটে এসে দেখি, রিসোর্টটি দাউ দাউ করে জ্বলছে।’ এভাবেই কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন রিসোর্টে আগুন লাগার দৃশ্যের বর্ণনা দেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজিজ (৪২)।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে রিসোর্টের ভেতরে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি দেখতে পেলেও তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন ছিল। সমুদ্রতীরের খোলা পরিবেশে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তীব্র বাতাস বইছিল। এতে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড গরমে কাঠ শুকিয়ে যাওয়ায় আগুনের তীব্রতা বাড়ে। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই রিসোর্টটির প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে ছাই হয়ে যায় বলে তাঁর ভাষ্য।
আজ শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে টুপটুপ রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে রিসোর্টটির বড় অংশ পুড়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ২০ শতক জমির ওপর রিসোর্টটির তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের চারপাশের দেয়াল ও খুঁটি ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। নিচতলা থেকে ওপরের তলায় ওঠানামার সিঁড়িতেও লোহার কাঠামোর ওপর কাঠের তক্তা বসানো। তিনতলার ছাদ টিনের।
ভবনের পশ্চিম পাশে কাঠ দিয়ে সম্প্রসারিত অংশে ছিল রেস্তোরাঁ। গাছের খুঁটির ওপর তৈরি এ অংশের বেশির ভাগ খুঁটি ঝাউ ও আকাশমণি গাছের। নিচতলার কয়েকটি কক্ষে ছিল রান্নাঘর, গুদাম ও কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা। রিসোর্টটির পেছনে রয়েছে একটি সুপারিবাগান।

আগুনে রিসোর্টের উত্তর পাশের একটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানটির মালিক গিয়াস উদ্দিন (৪০) বলেন, তাঁর চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের তৈরি কিছু অংশ পুড়ে গেছে। তিনিও সকাল সাতটার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তখন রিসোর্টের ভেতরে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি করতে দেখেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে ভেতরে ঢুকে তাঁদের উদ্ধারের কোনো উপায় ছিল না।
রিসোর্টের পেছনের সুপারিবাগানের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। পরে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে বলে তাঁর ধারণা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে কাঠের হওয়ায় আগুনে সেগুলো পুড়ে যায়। ফলে অতিথিরা নিচে নামতে পারেননি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভবনটিতে বের হওয়ার বিকল্প পথ ছিল না। কেউ কেউ বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ইনানী সৈকতের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আগে দেখেননি তাঁরা। আগুনের সূত্রপাত, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আগুনে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক।