ফিচার ডেস্ক

দুধ কিংবা দুধের তৈরি যেকোনো জিনিস খেলে তা হজম হয় না। এমন সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। মানবদেহের বিবর্তনের ইতিহাসে দুধ হজম করার ক্ষমতা অর্জন বা ল্যাকটোজ পারসিস্টেন্স একটি অন্যতম সেরা ও কৌতূহলে ভরা উদাহরণ। শৈশব পেরিয়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে ল্যাকটেজ এনজাইমের তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই এনজাইম সারা জীবন সক্রিয় থাকে। ফলে তারা কোনো শারীরিক জটিলতা ছাড়াই সরাসরি দুধ হজম করতে পারেন। তবে এই বিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে, কেন কিছু জনগোষ্ঠী জিনগতভাবে এই ক্ষমতা অর্জন করলেও, অন্যরা কেবল সাংস্কৃতিক বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে দুধ পানে অভ্যস্ত হয়ে উঠল?
ল্যাকটোজ পারসিস্টেন্স কেন বিবর্তনীয় ধাঁধা
জন্মের পর সব স্তন্যপায়ী শিশুর শরীরেই মায়ের দুধের ল্যাকটোজ ভাঙার জন্য ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরি হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে (সাধারণত উইনিং বা স্তন্যপান ত্যাগের পর) এই এনজাইমের উৎপাদন প্রাকৃতিকভাবে কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ল্যাকটোজ নন-পারসিস্টেন্ট। অর্থাৎ তারা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট। কাঁচা দুধ পান করলে তাদের পেটে গ্যাস, ক্র্যাম্প, ফুলে যাওয়া বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তা সত্ত্বেও, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জিনগত মিউটেশনের ফলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরি অব্যাহত থাকে। যেমন—যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ এবং ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ডের ৯৬-৯৭ শতাংশ মানুষ জিনগতভাবে ল্যাকটোজ সহনশীল। প্রচলিত সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক হাইপোথিসিস অনুযায়ী, যেসব সমাজে গবাদিপশু পালন শুরু হয়েছিল, সেখানে দুধের পুষ্টিগুণ ও ক্যালরি পাওয়ার জন্য মানুষ জিনগতভাবে এই সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু এই তত্ত্বের ব্যতিক্রমও রয়েছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

মধ্য এশিয়া: ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ
যেখানে পশুপালন এবং ডেইরি পণ্যের ওপর মানুষের নির্ভরতা সর্বোচ্চ, সেখানে সবার ল্যাকটোজ সহনশীল থাকার কথা। কিন্তু মধ্য এশিয়া অর্থাৎ মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান ও আশপাশের অঞ্চলের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। মঙ্গোল ও কাজাখ পশুপালকদের গ্রীষ্মকালীন মোট খাদ্যশৈলীর প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে ডেইরি পণ্য থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে যে আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ বছর আগে উত্তর কাজাখস্তানের বোটাই সংস্কৃতির মানুষ ঘোড়ার দুধ পান করতেন। অথচ বর্তমান সময়ে মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পশুপালকদের মধ্যে ল্যাকটোজ সহনশীলতার হার মাত্র ১২ থেকে ৩০ শতাংশ। এর কারণ কী? প্রাচীন ডিএনএ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্য এশিয়ায় যে মিউটেশনটি ল্যাকটোজ পারসিস্টেন্সের সঙ্গে যুক্ত তা ব্রোঞ্জ যুগের শেষ দিকে উপস্থিত ছিল। কিন্তু ইউরোপের মতো পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়নি। সেখানে এর হার ৫ শতাংশের আশপাশে রয়ে গেছে। অর্থাৎ, মধ্য এশিয়ার মানুষেরা জিনগতভাবে ল্যাকটোজ হজম করার ক্ষমতা অর্জন না করেই ডেইরি সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
কেন ইউরেশিয়ায় এত তফাত
ইউরোপে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিনের মিউটেশন প্রবলভাবে নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু এশিয়ায় তা হয়নি। এর মূল কারণ হলো খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বা সাংস্কৃতিক রূপান্তর। মধ্য এশিয়ায় কখনোই কাঁচা বা তাজা দুধ সচরাচর পান করা হয় না। ঘোড়ার দুধ ল্যাকটোজে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেখান থেকে ঐতিহ্যবাহী অ্যালকোহলিক ও ফার্মান্টেড পানীয় যেমন ‘কিমিজ’ বা ‘আইরগ’ তৈরি করা হয়। গাঁজন বা ফারমেন্টেশনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়া দুধের ল্যাকটোজের পরিমাণ অনেকটাই ভেঙে ফেলে। এ ছাড়া এই উপকারী ব্যাকটেরিয়া পেটে গিয়ে ল্যাকটোজ হজমে সহায়তা করে এবং কোলনে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা উপসর্গ ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ভারতের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের ডেইরি ঐতিহ্যও মূলত ঘি, দই এবং ফারমেন্টেশন বা প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যার কারণে দক্ষিণ এশিয়াতেও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ প্রচুর পরিমাণে ডেইরি খাদ্য গ্রহণ করে থাকে।
ক্যালরি নাকি বেঁচে থাকার লড়াই
ইউরোপ ও আফ্রিকায় কেন জিনগতভাবে ল্যাকটোজ পারসিস্টেন্স এত শক্তিশালীভাবে নির্বাচিত হলো, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে খাদ্য সংকট বা খরা চলাকালীন সময়ে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু মানুষেরা ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতায় মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকত। পক্ষান্তরে, যাদের জিনগতভাবে দুধ হজমের ক্ষমতা ছিল, তারা দুধের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও তরল পেয়ে বেঁচে থাকত। অস্বাস্থ্যকর ও ঘন জনবসতিতে প্যাথোজেনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে দুধ একটি জীবন রক্ষাকারী পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করেছিল। দুধের নিয়মিত পুষ্টি নারীর প্রজনন ক্ষমতা বা উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করেছিল, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমান বৈচিত্র্য এবং ভৌগোলিক বিন্যাস
বিশ্বজুড়ে ল্যাকটোজ সহনশীলতার হার ভৌগোলিক অবস্থান এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে ল্যাকটোজ সহনশীলতার হার সর্বোচ্চ। যা ৯৫ শতাংশের বেশি। দক্ষিণ ইউরোপের গ্রিস বা ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপে এই হার অনেক কম। ১৭ শতাংশ বা তারও নিচে থাকা এই পরিসংখ্যানটি খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের পার্থক্যের নির্দেশ করে। আফ্রিকার গবাদিপশু পালনে যুক্ত জনগোষ্ঠী উচ্চমাত্রার ল্যাকটোজ সহনশীলতা প্রদর্শন করে। যেমন রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডির তুতসি জনগোষ্ঠী এবং কিছু মাসাই সম্প্রদায়। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।
দুধ হজমের বিবর্তন এই কথাই প্রমাণ করে যে মানবজাতি কেবল জৈবিক বা জিনগত মিউটেশনের ওপর নির্ভর করেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়নি। এখানে বুদ্ধিমত্তা ও সংস্কৃতির প্রয়োগও কাজ করেছে। যেমন দুধকে ফারমেন্ট বা প্রক্রিয়াজাত করা। এগুলো অনেক সময় জিনগত রূপান্তরের বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপীয়রা যেখানে জিনগত মিউটেশনের মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়মকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি দুধ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ সংস্কৃতির জোরেই ডেইরি সংস্কৃতিকে নিজেদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সফলভাবে যুক্ত করে নিয়েছে।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

