সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের এক নারী। প্রথম ছয় মাস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও টাকা পাঠালেও পরে সব বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে স্বজনরা জানতে পারেন, তিনি সৌদি আরবের কারাগারে। তবে কী অপরাধে তিনি বন্দি, তা জানতেন না পরিবারের সদস্যরা। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও তাদের কাছে পৌঁছায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পাঁচ দিন পর পরিচয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দা। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দেশটিতে গিয়েছিলেন তিনি। তবে কী অপরাধে তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই পরিবারের কাছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবে এক বাংলাদেশি নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। ঘটনার পাঁচ দিন পর, সোমবার রাতে তাদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নারীর পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল ২০২২ সালের মে মাসে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র পান তিনি।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ওই নারীর বাড়ি ও বাবার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা পাননি।
সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ওই নারী। টাকাও পাঠাতেন স্বজনদের কাছে। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে সৌদি আরবে থাকা অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তিনি কারাগারে রয়েছেন। এরপর থেকে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়।
ওই নারীর বড় বোন বলেন, একবার বোন তাকে জানিয়েছিলেন, তারা একটি কক্ষে অনেক মেয়ে একসঙ্গে থাকতেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন গাড়ি কিনেছিলেন। এ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর তাদের মালিক সবাইকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে বোনকে জানিয়েছিলেন তিনি।
বড় বোনের ভাষায়, ‘একবার বলছিলে, আমরা এক রুমে অনেক মেয়েরা আছিলাম। তারা গাড়ি কিনছিল, এটার অভিযোগে তাদের মালিক সবাইকে ধরাইয়া দিছিল, এইটুকু সে বলছে। কিন্তু পরবর্তী সময় কি হইছে আর কিছু বলে নাই।’
এরপর বিষয়টি নিয়ে আর প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলেন ওই নারী। দেশে ফিরলে সব খুলে বলবেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, কিংবা ওই অভিযোগের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বোনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন বড় বোন। সৌদি আরবে থাকা ওই নারীর এক বান্ধবী ফোন করে বিষয়টি জানান এবং একটি ভিডিও পাঠান। এর আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কিছুই জানতেন না স্বজনেরা।
পরিবারের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার সময় মক্কা শরিফের ভেতরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছিলেন ওই নারী।
তার বাবা জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে দুই বছর সংসার করার পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২৩ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান মেয়ে।
আগের সংসারে কোনো সন্তান না থাকায় নিজের বোনের মেয়েকে লালন-পালন করতেন ওই নারী। সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত টাকা পাঠালেও কারাগারে যাওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
সৌদি আরবে একই সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি পুরুষটির বিষয়ে ওই নারী পরিবারের সদস্যদের কখনো কিছু জানাননি বলে দাবি করেছেন স্বজনরা।
কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি ১৫ দিন থেকে এক মাস পরপর পরিবারের সদস্যদের ফোন করতেন ওই নারী। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে আসার আগে গত সপ্তাহেও তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
তার ভাগ্নির ভাষ্য, গত সপ্তাহের বুধবার সৌদি আরবের কারাগার থেকে ফোন করেছিলেন তিনি। কিন্তু টেলিফোন লাইনে সমস্যার কারণে সেদিন কথা বলা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। শেষবার কথা বলার সময়ও ওই নারী এমন কোনো পরিস্থিতির কথা জানাননি, যা থেকে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা করা যেত।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, মির্জাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মঙ্গলবার সকালে ওই নারীর বাড়ি ও পরিবারের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পেয়েছেন তিনি। তবে এখনো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।
সৌদি আরবের গণমাধ্যমে গত বুধবার এক বাংলাদেশি নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ বা সৌদি আরবের সরকার তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। পাঁচ দিন পর সোমবার রাতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ।
