দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, কারাবাস ও নির্যাতনের পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। দীর্ঘ দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতায় ফেরার পর তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। কিন্তু সরকার গঠনের প্রায় আট মাসের মাথায় দলটির তৃণমূলের একাংশে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের অভিযোগ, অতীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা একশ্রেণির ব্যক্তি এখন বিএনপির পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের কেউ কেউ স্থানীয় রাজনীতি, দলীয় পদ-পদবি, ঠিকাদারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা-কর্মীরা অনেক জায়গায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা ঘিরে এই তৎপরতা আরও বেড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়া, দলীয় সমর্থন আদায় এবং সাংগঠনিক পদ পাওয়ার দৌড়ে নেমেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত থাকা ব্যক্তিদেরও দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ত্যাগের চেয়ে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও প্রভাব কোথাও কোথাও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের আন্দোলনে যারা মামলা, কারাবাস, নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই প্রবণতা আরও বাড়লে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ এবং তৃণমূলে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
আরও পড়ুন
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আসলাম হোসেন প্রিন্সের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।
খবরের কাগজকে আসলাম হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার মামলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলায় নির্যাতন-হয়রানির শিকার হয়েছি। আমাদের ত্যাগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত।’
আরও পড়ুন
নিজ ইউনিয়নে আলহাজ আবেদ আলী সরদারকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে সুবিধাবাদী অবস্থানের অভিযোগ তুলেছেন আসলাম। তিনি দাবি করেন, আলহাজ আবেদ আলী সরদার আগে বিএনপির চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়িক স্বার্থে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। তৎকালীন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলী তার বাসায় যেতেন বলেও দাবি করেন আসলাম। ওই সময়ে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের পর সেই আবেদ আলী সরদার আবার বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন এবং অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে পুরোনো অবস্থান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনে অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা পর্যায়ের নেতারা তাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বলেও দাবি করেন আসলাম।
আরও পড়ুন
তৃণমূলের এই নেতার বক্তব্য, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ত্যাগের চেয়ে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের পক্ষে রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আবেদ আলী সরদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
একই কুড়িগ্রামের উলিপুরের বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, ১৭ বছর যাদের দেখা যায়নি, তাদের এখন কদর করছেন নেতারা। এমন যদি হয়, তাহলে ত্যগীরা নীরবে হারিয়ে যাবে। ত্যাগী যারা, তারা একটু অভিমানী হয়।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর রায়গ্রাম ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ইসরাইল হোসেন জীবন ২০০১ সালের আগে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। বিএনপি যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল, তখন তাকে তেমন দেখা যায়নি। তবে ৫ আগস্টের পর তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এখন তিনি ক্ষমতাবান। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ইসরাইল হোসেনের বিরুদ্ধে।
বিএনপির ত্যাগীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়ায় দীর্ঘদিনের নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসরাইল হোসেন জীবন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আগে বিএনপি শক্তিশালী ছিল, এখন আমাদের আসনে দল ছন্নছাড়া। আমরা আগের অবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করছি।’ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন তিনি।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষক দলে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আমিনুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদান বিবেচনায় না নিয়ে শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হলে ক্ষোভ বাড়বে। এতে দলীয় কোন্দল তীব্র হওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষিত কর্মীদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন কেউ বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হলেই তাকে সুবিধাবাদী হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। আজ যেসব অনিয়মের অভিযোগ দলের বিরুদ্ধে আসে, সেগুলো নব্য বিএনপি করছে। ত্যাগীরা কখনো এসবে জড়িয়ে যেতে পারে না।
দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের মতে, মূল বিবেচনা হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক অতীত, বর্তমান কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা এবং দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য। অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বিএনপির জন্য এখন চ্যালেঞ্জ শুধু স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করা নয়। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক শক্তি অটুট রাখা। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং দখল-চাঁদাবাজিসহ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া গেলে তৃণমূলের আস্থা বাড়তে পারে।
গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুন্নবী টিটুল খবরের কাগজকে বলেন, ৫ আগস্টের আগে যারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ করতেন কিংবা তাদের সঙ্গে ছিলেন, তারা বিএনপির কেউ নন। তারা সুবিধাবাদী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা মনোনয়ন পাবেন না। এ বিষয়ে জেলা বিএনপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যোগ্য ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। শুধু দলের নেতাদের কাছে জনপ্রিয় হলেই হবে না, ভোটারদের কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ ধরনের সুবিধাবাদীরা কার্যত রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী খবরের কাগজকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করছেন, তাতে যোগ্য ব্যক্তিরাই মনোনয়ন পাবেন।
দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ও দলীয় পদায়নের ক্ষেত্রে ত্যাগ, যোগ্যতা, জনসমর্থন এবং সাংগঠনিক অবদান যথাযথ গুরুত্ব পাবে। তাদের মতে, ক্ষমতার বলয়ে নতুন মুখের উপস্থিতি নয়, যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে প্রভাবশালী অবস্থানে জায়গা দেওয়া এবং দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহারই বড় উদ্বেগের বিষয়। এই জায়গায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে তৃণমূলের ক্ষোভ আগামী দিনে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্যের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
