ঢাকাকে অনেকে বলেন, রিকশার নগরী। সেই রিকশায় এখন মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারিযুক্ত হবার পর থেকেই রিকশা নাগরিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে, আর এ কারণেই সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়েছে।
চলতি বছরের গত এপ্রিল পর্যন্ত ৩৭১টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে ৮৭০টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৫ জন। অগণিত অটোরিকশা কেউ বলছেন, সংখ্যাটি ১২ লাখ। তাদের দাপটে এবং বেপরোয়া চলাচলে নাগরিক জীবন এখন হুমকীর মুখে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার পাশাপাশি যাত্রী হয়রানির মত নাগরিক দুর্ভোগ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।
এদিকে সরকার এই অযান্ত্রিক যান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নিয়েও তাতে সফল হতে পারেননি। বিশেষ করে সরকারের সব আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রভাবশালীরা এই অযান্ত্রিক বাহন টিকিয়ে রেখেছে। অভিযোগ আছে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে প্রশাসনের এমন অনেকেই আছেন যাদের মালিকানায় শত শত ব্যাটারি চালিত রিকশা রয়েছে।
সম্প্রতি এক রাজনীতিবিদের নিজস্ব সাতশ অটো রিকশা রয়েছে বলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন। এই রিকশার কারণে নিরাপদ সড়ক অনেকটাই অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনার উৎসে নতুন যোগ হয়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা। গতবছর অটোরিকশার কারণে সারাদেশে মোট ৮৭০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী একটি সংগঠন এ তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে এ সব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮৭৫ ও আহতের সংখ্যা এক হাজার ৭৭৯।
অটোরিকশার লাগামহীন দৌরাত্ম্য : সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বিভিন্ন সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা বা ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আলোচনা হলেও সরকারগুলো তা কার্যকর করতে পারেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, পারেনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারও। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক-মহাসড়ক, সর্বত্র এখন অটোরিকশার দখলে।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলেও পতন ঘটেনি ব্যাটারি চালিত অটো রিকশার। বর্তমানে এই অটোরিকশার দৌরাত্ন্য সরকার পরিবর্তনের পর যেন আরো বেড়ে গেছে এমনটিই মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বিগত কয়েক মাসে অনেকবার ব্যাটারি চালিত রিকশাচালকরা অটোরিকশা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন এবং অটোরিকশা চালকরা স্বভাবতই তার বিরোধিতা করেছেন।
এমনকি, অটোরিকশা প্রধান সড়কে চলতে পারবে নাকি পারবে না, এই বিতর্কের জের ধরে মারপিটের ঘটনাও ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছুদিন পরপরই ঘটছে। এক্ষেত্রে ঢাকার বনানীতে অটোরিকশা চালকদের সঙ্গে পথচারী-বাইকারদের সংঘর্ষের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গুলশান সোসাইটি কয়েকদিন আগে ঘোষণা করে যে ওই এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে না। কিন্তু সোসাইটির ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি রিকশাচালকরা। তারা সিদ্ধান্ত না মেনে গুলশানের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা চালানোর দাবি জানিয়েছে।
পরে গত ২১ এপ্রিল সোসাইটির লোকজন ওই এলাকার রাস্তায় চলমান কিছু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে আটক করলে চালকরা ক্ষুব্ধ হন এবং এক পর্যায়ে তাদেরকে পথচারী-বাইকারসহ আন্দোলনের ধারণকারীদেরকে লাঠি দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার ঘোষণা করেছে, বাজারে নতুন নকশার রিকশা আসবে, যার ব্রেকিং ব্যবস্থা এখনকার অটোরিকশার চেয়ে ভালো ও নিরাপদ। বলা হচ্ছে, সরকার শীঘ্রই এই রিকশার অনুমোদন দেবে। পাশাপাশি, চালকদের লাইসেন্সও দেওয়া হবে। এ জন্য প্রচলিত স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ সংশোধন করা হচ্ছে।
পুলিশের তালিকায় থাকে না অনেক তথ্য : সাধারণত ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা থেকে শুরু করে অন্যান্য যানবাহন সংক্রান্ত দুর্ঘটনার নানা ধরনের তথ্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরই) কাছে পাওয়া যায়। তবে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য তারা সংকলন করতে পারেনি। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক জানান, তারা ওই তথ্যগুলো পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু বর্তমানে পুলিশের কাছ থেকে পূর্ণ সহায়তা না পাওয়ায় আপাতত তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে না।
তাছাড়া, অনেক তথ্য পুলিশের তালিকায় থাকে না বলেও তিনি জানান। তবে গত বছরের নভেম্বরে এআরই থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্যও পাওয়া গিয়েছিলো। ওই তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাটারি চালিত তিন চাকার যানবাহনের কারণে সারাদেশে ৯০০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মাঝে ৫৮২টিই ছিল মারাত্মক। এআরই’র সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ওই সময় বলেছিলেন, এই দুর্ঘটনাগুলোর মাঝে একটা বড় সংখ্যাই হলো অটোরিকশা এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা বাস্তবে নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি।
এদিকে, সড়ক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গতবছর ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার কারণে সারাদেশে মোট ৮৭০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮৭৫ ও আহতের সংখ্যা এক হাজার ৭৭৯।
গত বছরেই অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে গুরুতর আহত অবস্থায় তিন হাজার ৯১ জন পুরুষ ও এক হাজার ৮৪ জন নারী চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন বলেও জানায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এই সংগঠনটি আরো জানিয়েছে, চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৩৭১টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৩৭৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০৯ জন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে চলাচলকারী ৬০ লাখ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার কারণে সংগঠিত সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের প্রতিটি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচ জন জন ভর্তি হচ্ছেন। প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১৫ থেকে ১৭ জন, প্রতিটি বিভাগীয় হাসপাতালে আহত রোগী ভর্তি হচ্ছেন ২০ জন ।
সমিতি’র মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছোট যানবাহন। তাই, হতাহতের সংখ্যা এক বা দুইজন জন হারে হয় বলে গণমাধ্যমের কাছে এগুলো অতটা গুরুত্ব পায় না। সারাদেশে সংগঠিত ঘটনার মাত্র ১০ শতাংশ সংবাদ মাধ্যমে স্থান পায়। দেশের সরকারি-বেসরকারি চার হাজার হাসপাতালে প্রতিবছর গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ভর্তি হচ্ছে।
সমাধান কী হতে পারে? : অগণিত অটোরিকশা সম্পর্কে কেউ কেউ বলছেন, সংখ্যাটি প্রায় ১২ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধীরগতির শহর ঢাকার আরো ধীর হওয়ার অন্যতম কারণ এই রিকশা। এর মাঝে বর্তমান সরকার অটোরিকশা নিয়ে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আত্মঘাতী। অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ঢাকায় ইজি বাইক, অটোরিকশা পঙ্গপালের মতো প্রতিদিন বাড়ছে, এর মাঝে এটিকে রেগুলারাইজের কথা বলা হচ্ছে। ঢাকার রাস্তায় রিকশা, ফুটপাত, বাস নিয়ে নানা সমস্যা তো আছেই।
এর মাঝে এটাকে (রিকশা) বৈধতা দিয়ে সরকার দ্বিতীয় সমস্যা তৈরি করছে। একবারও তারা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে দেখছেন না। তিনি জানান, ঢাকায় সাড়ে সাত শতাংশ রাস্তা আছে, যার গুণগত মান ঠিক নেই। অর্থাৎ, মানুষ কিংবা যানবাহন, কারোরই চলার মতো অবস্থা নেই ঢাকায়। বাংলাদেশে দুই দশক আগেও রিকশা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। তখন রিকশাকে লাইসেন্স দিয়েছে, চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বর্তমান সরকার অতীতের দিকে না তাকিয়ে অপেশাদারি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে মত তার।
বিআলো/অর্নব