সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। বুধবার (১ অক্টোবর) সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই তীব্র কূটনৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে, অভিযুক্তদের পরিবার কিংবা জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো ধরনের পূর্বতথ্য না জানিয়ে এই রায় কার্যকর করায় ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও দেশের কূটনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাਤੇ প্রকাশিত খবরে জানানো হয়, মক্কার একটি মসজিদে অশালীন কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ওই দুই বাংলাদেশিকে আটক করেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আটকের সময় থেকে শুরু করে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ বা ভিকটিমপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি। এমনকি নিহতরা সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক কি না, সে বিষয়েও দূতাবাসের মাধ্যমে কোনো রকম যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি বিশ্লেષকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভিয়েনা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটেছে। ১৯৬৩ সালের ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস’-এর ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক কোনো দেশে আটক বা বন্দি হলে তাঁর অনুরোধে বিলম্ব না করে নিজ দেশের কনস্যুলার বিভাগ বা দূতাবাসকে তা অবহিত করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী হওয়ায় বিদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার সুবিধা ও আইনি সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ মনে করেন, যেহেতু পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি একদিনে সম্পন্ন হয়নি এবং আপিল প্রক্রিয়া পেরিয়ে রায় কার্যকর করা হয়েছে, সেহেতু বাংলাদেশ দূতাবাসের বিষয়টি অবধারিতভাবে জানার কথা ছিল। ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা কোনো দেশের নাগরিক হলে সৌদি আরব এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পেত কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, বিচার প্রক্রিয়াটি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোর মধ্যে হওয়ায় সব ক্ষেত্রে দূতাবাসকে জানানো বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে বিদেশি নাগরিক হিসেবে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার তাদের ছিল।
এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দুই বাংলাদেশির মরদেহ ঠিক কোথায় রয়েছে কিংবা কবে নাগাদ তা দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঢাকাকে বা জেদ্দা মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানানোয় নিহতদের পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাস কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন না থাকায় মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই আকস্মিক ও গোপনীয় মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় গভীর শোকের পাশাপাশি তাদের স্বজনদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
