কঠিন সময়ে মানুষ এমন একজন নেতাকে খোঁজে, যাঁর কথায় ভরসা পাওয়া যায়। যিনি সংকটের গভীরতা বোঝেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার পরিণতি ভাবেন এবং চাপের মুখেও মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দীর্ঘ কর্মজীবনে এসব গুণের পরিচয় পাওয়া যায়। হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ডের শিক্ষা, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কাজের অভিজ্ঞতা এবং দুটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন এক বিরল পরিচিতি। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই এখন কানাডার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
কার্নির প্রতি আস্থা কানাডার সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক জনমত ও অর্থনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মূল্যায়নেও উঠে এসেছে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান লোয়ি ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের জরিপে বিশ্বপরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত নেতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আস্থা পেয়েছেন কার্নি। তাঁর ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন ৬৬ শতাংশ অস্ট্রেলীয় উত্তরদাতা। একটি দেশের মানুষের মতামত হলেও এই ফল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার উল্লেখযোগ্য নজির।
এই আস্থা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং সংকটের মধ্যে কাজ করার অভিজ্ঞতা। কার্নি এমন সময়ে কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে আসেন, যখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ঘনিয়ে আসছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বও তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। নিজের দেশের বাইরে আরেকটি বড় অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার সুযোগ তাঁর পেশাগত যোগ্যতার প্রতি গভীর আস্থারই পরিচয়।
তাঁর শিক্ষাজীবনও সেই যোগ্যতার শক্ত ভিত তৈরি করেছে। ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কার্নি। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৯৫ সালে অর্থনীতিতে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। অর্থনীতির জটিল বিষয়গুলো নিয়ে এই দীর্ঘ পড়াশোনার সঙ্গে পরে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার ও সরকারি নীতি প্রণয়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
জনসেবায় যোগ দেওয়ার আগে গোল্ডম্যান স্যাকসের লন্ডন, টোকিও, নিউইয়র্ক ও টরন্টো কার্যালয়ে মোট ১৩ বছর কাজ করেন তিনি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে কাজের সুবাদে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং বাজারের আচরণ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। পরে ব্যাংক অব কানাডার ডেপুটি গভর্নর ও কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ দায়িত্বে কাজ করেন। ফলে বেসরকারি খাত ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, দুই ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাই যুক্ত হয় তাঁর কর্মজীবনে।
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক অব কানাডার গভর্নরের দায়িত্ব নেন কার্নি। কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে আর্থিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব দেওয়া ছিল কঠিন এক দায়িত্ব। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর সংকট মোকাবিলার পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
২০১৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে কাজ করেন ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত। এই সময়ে ব্রেক্সিটকে ঘিরে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের আস্থা কত গভীরভাবে জড়িত, তা বোঝার এবং সেই আস্থা ধরে রাখতে কাজ করার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তাঁর এই দায়িত্বকাল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্নির কাজের মূল্যায়ন করেছেন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দও। টাইম সাময়িকীর ২০২৬ সালের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় কার্নিকে নিয়ে লেখা নিবন্ধে তিনি আর্থিক সংকটে তাঁর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি চিহ্নিত করার সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও কার্নির ওপর নিজের আস্থা জানিয়েছেন লাগার্দ।
কার্নির নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তাৎক্ষণিক সমস্যার পাশাপাশি সামনে কী ধরনের বিপদ আসতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া। অর্থনীতিতে একটি সিদ্ধান্তের ফল অনেক সময় কয়েক বছর পর স্পষ্ট হয়। সে কারণে বর্তমানের সুবিধার সঙ্গে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার হিসাবও জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেই অভিজ্ঞতা কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
দেশের মানুষের মধ্যেও তাঁর প্রতি আস্থার প্রতিফলন রয়েছে। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত লেজারের জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজ অনুমোদন করছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে সন্তুষ্ট ৫৭ শতাংশ। ৯ থেকে ১২ অক্টোবর পরিচালিত এই জরিপের ফল বলছে, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাঁর নেতৃত্বকে সমর্থন করছেন।
এই আস্থাকে সাধারণ মানুষের জীবনে সুফল হিসেবে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তাঁর সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আবাসন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গত ৫ আগস্ট টরন্টোয় কার্নি তিন বছরে আবাসন প্রকল্পে ২৭০ কোটি কানাডীয় ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। পরিকল্পনার প্রাথমিক অংশে রয়েছে ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি নতুন ভাড়ার বাসা। আবাসনসংকটে থাকা মানুষের জন্য বাড়ির সরবরাহ বাড়ানো এবং বিভিন্ন আয়ের পরিবারের বসবাসের সুযোগ তৈরিই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
কানাডার মতো দেশের নেতৃত্বে অর্থনীতির গভীর জ্ঞান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। কার্নির শক্তি হলো, এসব বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিল এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের ভিত্তি দেয়। অভিজ্ঞতা শেখায় সেই জ্ঞান কখন ও কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। আর বিচারবোধ সাহায্য করে কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে। কার্নির কর্মজীবনে এই তিনটির সমন্বয় দেখা যায়। এ কারণেই তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা বড়, তাঁর কথার গুরুত্বও বেশি।
বিশ্বের আস্থাভাজন নেতাদের একজন হিসেবে মার্ক কার্নির অবস্থান বুঝতে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। দুটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সম্মান এবং জনমতে আস্থার নজির তাঁর নেতৃত্বের পক্ষে শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে সেই অর্জন সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁর ওপর মানুষের ভরসার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রত্যাশা: কঠিন সময়েও অভিজ্ঞ হাতে সঠিক পথটি খুঁজে নিতে পারবেন মার্ক কার্নি।
এনএন/ ২০ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::বিশ্বের আস্থাভাজন নেতাদের একজন হয়ে উঠেছেন কানাডার মার্ক কার্নি first appeared on DesheBideshe.