গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৭ কোটি টাকা আদায়ের নির্দেশ স্থগিত
গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি কর আদায়ে হাই কোর্টের নির্দেশ স্থগিত করেছে চেম্বার আদালত। তবে কর দাবির বৈধতা নিয়ে হাই কোর্টের রায় স্থগিত হয়নি। আগামী ১৩ ডিসেম্বর আপিল শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
জার্নাল ডেস্কগ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আদায়ে হাই কোর্টের দেওয়া নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেছে চেম্বার আদালত। তবে কর দাবির বৈধতা নিয়ে হাই কোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত করা হয়নি।
রোববার চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ১৩ ডিসেম্বর আপিল শুনানির জন্য দিন ঠিক করেছেন।
গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
আদেশের পরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছেন তাঁরা। শুনানিতে রায়ের যথার্থতা নির্ধারণের আগে কর আদায়ের জন্য এনবিআরকে দেওয়া অতিরিক্ত নির্দেশ স্থগিত চেয়েছিলেন। আদালত তা আমলে নিয়ে এই স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “হাই কোর্টের রায়টা সঠিক কি বেঠিক, এটা নির্ধারণ করার মালিক হচ্ছে আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ শুনানি হয়ে আপিল বিভাগের রায় না আসা পর্যন্ত এই ৬৬৬ কোটি টাকা এনবিআর আপাতত আদায় করতে পারবে না।”
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাই কোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের করা রুল খারিজ করে রায় দেন। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত এনবিআরকে দাবি নোটিশ জারি করে বকেয়া কর আদায়ের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ করবর্ষে ১৮৯ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৬ টাকা, ২০১৩-১৪ করবর্ষে ১৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ১২ টাকা, ২০১৪-১৫ করবর্ষে ১১৪ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৪ টাকা, ২০১৫-১৬ করবর্ষে ১১৫ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৫ টাকা এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষে ১১৫ কোটি ৬৩ লাখ ১ হাজার ৬৯৩ টাকাসহ মোট পাঁচ করবর্ষে এই কর দাবি করা হয়েছে।
মামলার পূর্বাপর
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণ পরিবারের একটি প্রতিষ্ঠান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান।
মামলার নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে অনুদান ও ঋণ হিসেবে পাওয়া ৩২০ কোটি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৪ টাকার তহবিল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণের অর্থে গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করা হয় এবং ওই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ গ্রামীণ কল্যাণের পাওয়ার কথা ছিল। তবে এই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
কর কর্তৃপক্ষের অবস্থান ছিল, গ্রামীণ কল্যাণের পাওয়া অর্থ লভ্যাংশ আয় নয়; বরং অন্যান্য উৎস থেকে আয়। ফলে ওই অর্থের ওপর সাধারণ হারে কর প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে গ্রামীণ কল্যাণের দাবি, গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছিল। ফলে একই আয়ের ওপর পুনরায় কর দাবি করা হলে দ্বৈত করের পরিস্থিতি তৈরি হবে।
২০১৭ সালে কর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারা অনুযায়ী, অধস্তন কর্তৃপক্ষের আদেশ সংশোধনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার ওই অর্থকে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করেন।
২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। পরে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা কর দাবি করা হয়।
কর কমিশনারের ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে পৃথক দুটি রিট মামলা করে গ্রামীণ কল্যাণ। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি কর কমিশনারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদনও করে।
তবে স্বীকৃত করদায় পরিশোধ না করায় আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারার শর্ত অনুযায়ী ওই পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হয় বলে আদালতের রায়ে বলা হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাই কোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিট আবেদন দুটি খারিজ করে রায় দেন। একই বছরের ২৯ আগস্ট বেঞ্চটি ওই রায় প্রত্যাহার করেন।
কারণ হিসেবে বলা হয়, বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এ কারণে রায় দুটি ত্রুটিপূর্ণ হবে বলে মনে করে নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরে প্রধান বিচারপতি মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাই কোর্ট বেঞ্চে পাঠান। শুনানি শেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট মামলা খারিজ করে দেন।
হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকম পৃথক আইনগত সত্তা হওয়ায় তাদের আয়করও পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
২০১১ সালের ১৩ এপ্রিল গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে স্বাক্ষরিত ইক্যুইটি পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্টের শর্ত তুলে ধরে আদালত বলেন, ওই চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ারহোল্ডার নয় এবং গ্রামীণফোনের শেয়ারের ওপর কোনো শেয়ার দাবি করতে পারে না। ফলে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থকে লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
ওই অর্থকে অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে বিবেচনা করে সাধারণ হারে কর আরোপ আইনসম্মত এবং আদালত এ কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার ধ্রুপদী নজির’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
রায়ে বলা হয়, গ্রামীণ কল্যাণের নামে উৎসে কর কর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার বৈধ চালানও পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ টেলিকমের নামে থাকা চালান দেখিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ নিজেদের কর পরিশোধের দাবি করতে পারে না।
এ ছাড়া ২০১৭-১৮ করবর্ষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আয়কে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা রেফারেন্স মামলা ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর খারিজ হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগের করবর্ষগুলোর ক্ষেত্রে কর দিতে না চাওয়ার বিষয়টি ওই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রোববার গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০০৪ সাল থেকে গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণ ব্যাংকের ইক্যুইটি শেয়ারে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ করে আসছে। বিনিয়োগটি গ্রামীণ টেলিকমের নামে করা হয়েছিল এবং দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশ বণ্টন করা হয়।
আইনজীবীর ভাষ্য, ওই বিনিয়োগের বিপরীতে ২০০৪ সাল থেকেই উৎসে অগ্রিম কর কেটে রাখা হচ্ছিল এবং তা অনুমোদিত ছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০১৭ সালে এসে ওই অর্থকে গ্রামীণ কল্যাণের অতিরিক্ত আয় হিসেবে বিবেচনা করে কর দাবি করা হয়।
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমার আয় যদি অতিরিক্ত আয় হয়, তাহলে আমার যে অ্যাডভান্স ট্যাক্সটা তুমি কেটে রাখলা, তাহলে ওই ট্যাক্সটা কোথায় যাবে? আমি তো ডাবল ট্যাক্স দিতে পারব না।”
তিনি দাবি করেন, গ্রামীণ কল্যাণের পাশাপাশি গ্রামীণ টেলিকমের বিষয়টিও পরিদর্শন করে দেখা প্রয়োজন ছিল।
গ্রামীণফোন উৎসে কর কেটে রাখায় কর ফাঁকির সুযোগ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
২০১৭ সালে তৎকালীন সরকারের পরিদর্শনের ভিত্তিতে কর দাবির বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে তাঁরা আইনি লড়াই করছেন বলে জানান এই আইনজীবী।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
