Published on
:
3 min read
সোমনাথ মণ্ডল
দিদিকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন শ্রেয়া। কিন্তু পিলপিল করে বেরোতে থাকা মানুষের স্রোতের মুখে ব্যর্থ হলো তাঁর যাবতীয় প্রয়াস। শ্রেয়ার চোখের সামনেই ভিড়ের মধ্যে পড়ে যান তাঁর দিদি শুভম সোনকার। দিদিকে প্রাণপণে টেনে তুলতে গেলেন শ্রেয়া, কিন্তু পারলেন না। ভিড়ের চাপে পড়ে যাওয়া, ৩২ বছরের তরুণী শুভমকে মাড়িয়ে চলে গেল অসংখ্য পা। চারদিকে তখন শুধু মানুষের ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি আর প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। কোনও রকমে নিজে বেরিয়ে আসতে পারলেও দিদিকে শ্রেয়া ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে শনিবার, সপ্তমীর সন্ধেয় চোরবাগান সর্বজনীনে বড় ক্ষতি হয়ে গেল কাঁকুড়গাছির সোনকার পরিবারের।
এ দিন শুভমের সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা, বাবা ও বোন। পুজোয় একরাশ আনন্দ নিয়ে বেরিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সন্ধেয় চোরবাগানে গিয়ে সেই আনন্দই পাল্টে গেল বিষাদে। শ্রেয়ার মা ও বাবাও পড়ে গিয়েছিলেন, তবে তাঁদের শেষমেশ রক্ষা করা গিয়েছে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি শুভমকে। দিদিকে হারিয়ে পুজোর উদ্যোক্তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন শ্রেয়া। তাঁর কথায়, ‘মণ্ডপে বিপুল ভিড় জমে যাওয়া সত্ত্বেও আরও মানুষকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল। ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে লোকসমাগম বাড়ানোর দিকেই যেন বেশি নজর ছিল উদ্যোক্তাদের।’ পুজোয় ভিড় বাড়ানোর লক্ষ্যই কি শেষমেশ এত বড় বিপর্যয় ডেকে আনল? শ্রেয়ার অভিযোগ ঘিরে সেই সেই প্রশ্নই উঠছে।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শনিবার রাতে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়ার কথায় বার বার ফুটে বেরোচ্ছিল তাঁর অসহায়তার কথা— দিদিকে পড়ে যেতে দেখেও তুলতে না–পারার অসহায়তা। তাঁর বক্তব্য, ‘দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মানুষের ঢল নামবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভিড় সামলানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকবে না?’ ওই তরুণীর আরও প্রশ্ন, ‘পুজোর সাফল্য মানে কী? প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নাকি সে সব মাথায় না-রেখে শুধুই ভিড় বাড়ানো?’
এ সব প্রশ্ন তোলার অবস্থায় নেই নদিয়ার চাকদহের নতুনপাড়ার রাম সরকার। তিনি শুধু বিলাপ করছেন স্ত্রীর শোকে। রামের স্ত্রী আরতি সরকার বিশ্বাস (৪৫) চোরবাগানের বিপর্যয়ে মৃতদের অন্যতম। রামের কথায়, ‘মণ্ডপে তখন খুব ভিড়। হঠাৎই বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে মণ্ডপ থেকে বেরোতে বলা হলো। হুড়মুড় করে বেরোতে গেল সবাই। আমার স্ত্রী তখনই পড়ে যায়। তার পরে সবার নীচে তলিয়ে যায়। ও শারীরিক ভাবে খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। উঠতে পারেনি। আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না। আমাদের দু’জনের সঙ্গে আমার শালির মেয়েও বেরিয়েছিল ঠাকুর দেখতে। সে–ও পড়ে গিয়েছিল। তবে তাকে ওঠাতে পেরেছি।’
হুগলির বৈদ্যবাটির মালির বাগানের সুপর্ণা পোদ্দার তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে শনিবার সকালে ঠাকুর দেখতে কলকাতার উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। মাঝখানে দু’-একবার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে ২৭ বছরের ওই তরুণীর কথাও হয়েছিল। তখন কি কেউ জানতেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কী বিপর্যয় অপেক্ষা করছে! সুপর্ণা ছিলেন নিউ টাউনের টাটা মেডিক্যাল সেন্টারের নার্স। সুপর্ণার মায়েরও পেশা এক।
এ দিন সন্ধে সাড়ে ৭টা নাগাদ ফোন আসে সুপর্ণার বাবার কাছে। ও পার থেকে বলা হয়, ‘একটা দুঃসংবাদ দিচ্ছি। আপনার মেয়ে আর নেই। ঠাকুর দেখতে গিয়ে চাপা পড়ে মারা গিয়েছে। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসুন।’ মুহূর্তে যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল সুপর্ণার বাবা ও বাড়ির বাকি সবার। দুঃসংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন সুপর্ণার মামা বিশ্বনাথ দে। সুপর্ণার বন্ধুরা কোথায়, সেটাও এখনও জানা যায়নি। শনিবার রাতে চাঁপদানির বিধায়ক দিলীপ সিংহ বৈদ্যবাটির ওই বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সান্ত্বনা দেন।
হুগলিরই কোন্নগর থেকে বাড়ির বড়দের সঙ্গে পুজোর আনন্দ করতে এ দিন কলকাতায় এসেছিল সাত বছরের দৃশানী সরদার। কিন্তু চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা মুহূর্তে বদলে দিল সব কিছু। ভিড়ের চাপে গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালে ভর্তি দৃশানী। নাতনির এই পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না দৃশানীর দাদু অনিন্দ্যকুমার দাস। নাতনির জন্য কেঁদেই যাচ্ছেন তিনি। মেয়ের এই অবস্থার কথা জেনে জ্ঞান হারিয়েছেন মা অনন্যা দাস।
দৃশানীর বাড়ির লোকজনের কথায়, ‘সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ মণ্ডপ থেকে বেরোনোর মুখে আচমকাই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টি শুরু হতেই ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি পড়ে যায়। একের পর এক মানুষ পড়ে যেতে থাকেন। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আহত হয় দৃশানীও। উৎসবের ভিড়ে ঠিক কী ভাবে এমন বিপর্যয় ঘটে গেল, তা বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি পরিবারের সদস্যরা।’ দৃশানীর দাদু অনিন্দ্যর অভিযোগ, ‘ঘটনার পরে প্রথম আধ ঘণ্টা পুজো কমিটির কাউকে দেখা যায়নি। পরে পুলিশকর্মীরা এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।’ তিনি জানান, অন্ধকারের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তায় সময় কাটে সবার, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় সাহায্যের জন্য।
