রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর ঘটনাকে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে দাবি করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী একে আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জমিদারি ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি মাখানো নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেছেন, এ প্রতিবাদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান থেকেই রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি মাখানো হয়েছে।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববাংলার অবহেলিত মুসলমানদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান লিখেছিলেন শোষক বর্ণহিন্দু জমিদার রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গ্রাফিতিতে যারা কালি মেখেছেন, তাঁরা আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান থেকে প্রতিবাদস্বরূপ কাজটি করেছেন বলে তাঁরা মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ কোনো ধর্মের অবতার বা দেবতা নন। তাই রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা মানেই সাম্প্রদায়িকতা নয়। যারা তা মনে করেন, তাঁদের আধিপত্যবাদের ক্রীড়নক বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁর ভাষ্য, আধিপত্যবাদের হাতিয়ার রবীন্দ্রনাথকে সমর্থন করার আর কোনো উপায় না পেয়ে তাঁরা রবীন্দ্রসমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মবিদ্বেষের প্রসঙ্গ সামনে আনেন।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী আরও বলেন, বাংলাদেশের মুসলমানদের ওপর হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধরে রাখতে সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রবীন্দ্রবাদ’ প্রতিষ্ঠাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতার ব্রত মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যের মুখোশে তাঁরা মূলত ইসলামবিদ্বেষ ছড়ান। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৭ বছর তাঁদের এজেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই কাজ করেছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মুজিববাদী স্বৈরাচারের পতন হলে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্ট রবীন্দ্রপূজারীরা সংকটে পড়ে যান। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁরা এখনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এরই অংশ হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের আইকনদের চেয়েও অগ্রাধিকার দিয়ে আধিপত্যবাদের আইকনদের গ্রাফিতি এঁকে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “এই স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা আধিপত্যবাদের হাতিয়ার জমিদার রবীন্দ্রনাথের ‘প্রজা’ নই।” এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বাংলাদেশের আপামর জনগণের রাজনৈতিক কর্তব্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় ও সাহিত্যিক অবস্থান নিয়ে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী দাবি করলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধর্মাচার ও রচনায় হিন্দুত্ব ও হিন্দুধর্মেরই জয়গান গেয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো অর্থেই রবীন্দ্রনাথ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়কে রবীন্দ্রনাথকে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা পুরোনো আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুসলিমবিদ্বেষী ও হিন্দুত্ববাদী সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বঙ্কিমের অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রীতিমতো নভেল’ ছোটগল্পে মুসলমানদের ‘ম্লেচ্ছ’ ও ‘যবন’ বলে কটাক্ষ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ১৯০৪ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথ ‘শিবাজী উৎসব’ নামে একটি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী কবিতায় লিখেছিলেন, ‘এক ধর্মরাজ্য করিব, এ মহাবচন করিব সম্বল।’
জমিদারি আমলে রবীন্দ্রনাথ এ পারের মুসলিম কৃষকপ্রজাদের শোষণ করে ওপারে ধনসম্পদ গড়েছেন এবং পূর্ববাংলার হতদরিদ্র মুসলিম কৃষকপ্রজাদের উন্নয়নে কোনো অবদান রাখেননি বলেও অভিযোগ করেন আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
