দুর্গাপূজার ছুটিতে ফাঁকা হচ্ছে ঢাকা, বাড়ির পথে মানুষ

প্রভাত রিপোর্ট: দুর্গাপূজার ছুটি মানেই উৎসবের আমেজ, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো আর শেকড়ের টানে গ্রামের বাড়ি ফেরা। এবার শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে দীর্ঘ ছুটির সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজধানী ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন অনেকেই। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ছুটি থাকায় পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা। চলতি বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়েছে।
২০ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা পাচ্ছেন টানা পাঁচ দিনের অবকাশ। এর বাইরে সনাতন ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির চিত্র আরও বিস্তৃত। সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ছুটি ও পূজার ছুটি মিলিয়ে টানা ১০ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। ফলে যেসব পরিবারের সন্তান স্কুল-কলেজে পড়ে, তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ প্রায় ৯-১০ দিনের লম্বা ছুটি পেয়ে আগেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, ছুটির আবহ শুরু হতেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের উপচে পড়া ভিড়। টিকিট কাউন্টারগুলোতে ছিল সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ সারি।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছেন সিথি রায়। কথা হলে তিনি বলেন, রাজধানীতে কর্মরত অনেকের জন্য পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুব বেশি আসে না। কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্য সময়ে বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠে না। তাই এবারের দীর্ঘ ছুটি সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এজন্য সন্তানদের গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে নানাবাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে কুমিল্লাগামী যাত্রী অসিত কুমার দে বলেন, পূজায় এবার টানা ছুটি পাওয়ায় পরিবারের সবাই মিলে আগেই গ্রামে যাচ্ছি। প্রতিবছর তো দুই-এক দিনের বেশি ছুটি পাওয়া যায় না, এবার বেশ ভালো সময় কাটানো যাবে। বাচ্চাকাচ্চাদের স্কুলও আগেভাগেই বন্ধ হয়ে গেছে, তাই ভিড় এড়াতে একটু আগেই রওনা দিলাম।
একই চিত্র দেখা গেছে মহাখালী বাস টার্মিনালেও। সেখান থেকে ময়মনসিংহগামী যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. তানভীর আহমেদ জানান, সরকারি ছুটি শুরু হতে দু-এক দিন বাকি থাকলেও অফিসের কিছু বকেয়া ছুটি মিলিয়ে তিনি আগেই ছুটি নিয়ে নিয়েছেন। টানা ১০ দিনের মতো ছুটি পাচ্ছেন। ঢাকায় একা থেকে কী করবেন, গ্রামে স্বজনদের সঙ্গে পূজা ও ছুটির আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাচ্ছেন। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ছুটির কারণে যাত্রীচাপ স্বাভাবিক দিনের চেয়ে অনেক বেশি।
মহাখালী বাস টার্মিনালের এক পরিবহন মালিক প্রতিনিধি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের আগে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি ছুটি শুরু হলে এই চাপ আরও কয়েক গুণ বাড়বে। শারদীয় আনন্দ ও টানা ছুটির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীজুড়ে। যানজট ও পথের নানা ভোগান্তি সত্ত্বেও স্বজনদের মাঝে পৌঁছানোর তাড়নায় হাসিমুখে ঢাকা ছাড়ছেন হাজারো মানুষ।
রেলওয়ের বিশেষ উদ্যোগ, বাড়ছে নিরাপত্তা: শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে বাড়ানো হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি। টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্রবেশ ঠেকাতে স্টেশনের প্রবেশমুখে তৈরি করা হবে জিগজ্যাগ বেষ্টনী। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে নজরদারি, অতিরিক্ত কোচ চালু এবং বিশেষ টহলের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত ১২ অক্টোবর রেলভবনে রেলসচিব ফাহিমুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা, ২০২৬ সুষ্ঠুভাবে উদযাপন উপলক্ষে নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিতকরণে প্রস্তুতিমূলক সভায়’ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনসহ রেলওয়ে ও রেল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এপিবিএনসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। স্টেশন দুটির প্রবেশমুখে যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জয়দেবপুরসহ যেসব স্টেশনে প্রয়োজন, সেখানে অতিরিক্ত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।
সভায় নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯ ও ২০ অক্টোবর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ডগ স্কোয়াডসহ টহল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি) চিঠি পাঠানো হবে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি ও আরএনবির সমন্বয়ে কন্ট্রোল রুম স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উৎসবের সময় স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় ও টিকিটবিহীন প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বিশেষব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশমুখে টিকিটধারী যাত্রীদের সহজে প্রবেশ নিশ্চিত করতে জিগজ্যাগ বেষ্টনী তৈরি করা হবে। পাশাপাশি স্টেশন দুটির আশপাশে মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে থাকা অরক্ষিত প্রবেশপথগুলোতেও অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে।
প্রকৃত টিকিটধারী যাত্রী ছাড়া কেউ যাতে ট্রেনে উঠতে না পারেন, সে জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে টিকিট পরীক্ষা করা হবে। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে মই বা এ ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে কাউকে স্টেশনে প্রবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিফট পরিবর্তনের সময় দায়িত্ব গ্রহণকারী দল দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগে কর্মরত দল যাতে কর্মস্থল ত্যাগ না করে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে ২৩টি মিটারগেজ ও ছয়টি ব্রডগেজ কোচের পাশাপাশি আটটি অতিরিক্ত কোচ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৯ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাঁচটি ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন (অফ ডে) প্রত্যাহার করা হবে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচলের সুযোগ বাড়বে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিন জোড়া স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা করা হবে। ট্যুরিস্ট স্পেশাল-১ ও ২: ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে আগামী ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর চলাচল করবে। ঢাকা স্পেশাল-৩: চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগামী ২০ অক্টোবর চলাচল করবে। চট্টগ্রাম স্পেশাল-৪: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আগামী ২৪ অক্টোবর চলাচল করবে।
নজরদারি থাকবে। রেললাইনে ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে রেল কর্তৃপক্ষ, পূজা উদযাপন কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করবে। এ ছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। যাত্রীসেবার মান বজায় রাখতে সব ট্রেনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপূজার নবমী ও দশমীতে জনসমাগম বেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯ ও ২০ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ভিজিল্যান্স টিম এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান টিম গঠন করা হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উৎসবের সময় যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে চায় রেল কর্তৃপক্ষ।
সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির সঙ্গে দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ভ্রমণপিপাসু সাধারণ যাত্রীরা বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ট্রেনে ভ্রমণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি যাত্রীচাপ পরিলক্ষিত হবে।’
এ সময় রেলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখে দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন রেলসচিব। তিনি বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত কাজ হলো, ঘরমুখী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষকে সুষ্ঠু রেলসেবার মাধ্যমে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অধীন দপ্তরগুলোতে নির্দেশনা পাঠিয়েছে রেলওয়ে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) মামুনুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। আমাদের জানামতে, গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে সেভাবে ছুটি হবে না। যাত্রীদের চলাচল কেমন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে প্রস্তুতি আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, রেল ভবন থেকে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি। সেই অনুযায়ী আমাদের ব্যবস্থা নেয়া আছে। আরও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে।
More News Of This Category

