কুমারটুলির কোনো এক কর্মশালায় মাটির মুখে শেষ তুলির টান পড়ছে। কয়েক মাসের শ্রম, মাটি, খড়, বাঁশ আর শিল্পীর কল্পনা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক প্রতিমা। আলোয় সাজানো মণ্ডপে সেই শিল্প প্রশংসা পাবে, ভিড় টানবে, সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নেবে। অথচ উৎসবের আলো নিভে গেলে শিল্পীটির নিজের জীবনে কতটা স্বচ্ছলতা থাকে? সে খোঁজ কেউ রাখে না।
দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক ইতিহাস বুঝতে ফিরে তাকাতে হয় ঔপনিবেশিক বাংলার দিকে। আঠারো শতকের কলকাতায় ধনী জমিদার ও বণিকদের পারিবারিক পূজা ছিল সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন, বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন ধনী শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়োজনের জাঁকজমকও বাড়ে। পূজার আড়ম্বর হয়ে ওঠে সম্পদ, প্রভাব ও ক্ষমতার প্রকাশ্য ভাষা। রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে নবকৃষ্ণ দেবের ১৭৫৭ সালের পূজা নিয়ে বহুল প্রচলিত কাহিনিটির ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্য প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু কাহিনিটি যে সামাজিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, তা গুরুত্বপূর্ণ-ঔপনিবেশিক বাংলায় উৎসব, সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
২০২৬ সালের দুর্গাপূজার আগে ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারের কারিগরদের নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট এবং সাজসজ্জার পণ্যের বাজারে ক্রেতার অনীহার কথা। প্রতিমা তৈরির খরচ বেড়েছে; অন্যদিকে অলংকার, শাড়ি, মালা ও অন্যান্য উপকরণ বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, বেশি দামের কারণে ক্রেতারা কেনাকাটায় কাটছাঁট করছেন।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার অর্থনীতি বোঝার জন্য তাই বিপুল কোনো বাজারমূল্যের হিসাবের চেয়ে জরুরি হলো এই ছোট ছোট লেনদেনের দিকে তাকানো। একটি প্রতিমা তৈরিতে লাগে মাটি, বাঁশ, খড়, কাঠ, দড়ি, রং এবং একাধিক মানুষের শ্রম। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পোশাক ও অলংকারের দোকান, পরিবহন, মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, খাবারের স্টল এবং অস্থায়ী কর্মসংস্থান। উৎসবের কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে এই বিচিত্র কাজগুলো একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু উপকরণের দাম, মজুরি ও পরিবহন খরচ বাদ দেওয়ার পর কারিগর কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর হাতে কতটা থাকে, তার হিসাব উৎসবের বাহ্যিক জৌলুশে ধরা পড়ে না।
প্রতিমাশিল্পীদের অভিজ্ঞতা এই ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে। ঢাকায় প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত শিল্পীদের নিয়ে ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক দশক আগের তুলনায় প্রতিমা তৈরির ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিক্রয়মূল্য বাড়লেই শিল্পীর আয় দ্বিগুণ হয় না, সেই অর্থের বড় অংশ চলে যায় কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে। কাজও সারা বছরের জন্য সমানভাবে থাকে না। উৎসবের মৌসুমে তীব্র ব্যস্ততার পর অপেক্ষাকৃত কম কাজের সময় আসে। ফলে যে পেশা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি শিল্পঐতিহ্য বহন করছে, সেটিকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত জীবিকার প্রশ্নেও এসে দাঁড়ায়।
এই অর্থনীতি কেবল প্রতিমাশিল্পীদের নয়। দুর্গাপূজার আগে নতুন পোশাক, উপহার, সাজসজ্জার সামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাকাটা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি বেচাকেনার সুযোগ তৈরি করে। পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-এসবের মধ্য দিয়েও অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়। কিন্তু সব ব্যবসায়ী সমানভাবে লাভবান হন না। কোনো দোকানে বিক্রি বাড়তে পারে, আবার বেশি দামের কারণে অন্য দোকানে ক্রেতা কমে যেতে পারে। কোনো কারিগর অতিরিক্ত অর্ডার পেতে পারেন, অথচ শ্রমিকের অভাবে সময়মতো কাজ শেষ করতে গিয়ে তাঁর ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। উৎসবের অর্থনীতি তাই একমুখী সমৃদ্ধির গল্প নয়, এর ভেতরে রয়েছে লাভ, চাপ ও অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অবস্থান।
বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে, যেখানে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগর অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, এই মৌসুমি বাজারের গুরুত্ব আরও বেশি। উৎসব তাদের জন্য আয় ও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করে উৎপাদন ব্যয়, ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগের ওপর। উৎসবের দিনগুলোতে বাজার সরগরম হওয়া দৃশ্যমান, কিন্তু উৎসব শেষে একজন কারিগর কীভাবে সংসার চালাবেন, সেটি অনেক কম দৃশ্যমান।
এখানে ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নটিও অর্থনীতি থেকে আলাদা নয়। হাতে তৈরি প্রতিমা, স্থানীয় কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক নয়, এগুলো মানুষের পেশা, দক্ষতা এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা জ্ঞানের অংশ। উৎপাদনের খরচ বাড়লেও যদি পারিশ্রমিক সেই অনুপাতে না বাড়ে, কিংবা তরুণেরা এই পেশায় ভবিষ্যৎ না দেখেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পরিবারের আয় নয়-ক্ষয়ে যেতে পারে একটি শিল্পধারার ধারাবাহিকতাও। প্রযুক্তি ও নতুন উৎপাদনপদ্ধতি কাজের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল কারিগরের জীবনে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচ্য।
দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক গুরুত্বকে তাই শুধু উৎসবের মোট ব্যয় দিয়ে মাপা যায় না। দেখতে হবে, সেই ব্যয়ের কতটা স্থানীয় উৎপাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে থাকছে, শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হচ্ছে কি না, আর মৌসুমি কাজ দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার কোনো ভিত্তি তৈরি করতে পারছে কি না। বাংলাদেশে দুর্গাপূজাকে ঘিরে নির্ভরযোগ্য জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাবের ঘাটতি থাকায় উৎসবটির মোট বাজারমূল্য নিয়ে বড় অঙ্কের দাবি করার চেয়ে স্থানীয় বাজারের বাস্তবতা ও মানুষের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা বেশি জরুরি।
প্রতিমার চোখ আঁকা শেষ হলে উৎসব যেন প্রাণ পায়। মণ্ডপে আলো জ্বলে, দোকানে ক্রেতা আসে, মানুষের চলাচলে শহর ও জনপদ বদলে যায়। কিন্তু উৎসবের অর্থনৈতিক সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই আলো কেবল মণ্ডপের গায়ে নয়, কারিগরের সংসারেও পৌঁছাবে।
