স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগব্যবস্থায় বাধা এবং ভবিষ্যতে মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা কমে যাওয়ার ঝুঁকি ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আরও চাপে পড়তে পারে কিয়েভ।
লন্ডন সফরে ব্রিটিশ টক শো ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধের ঘটনায় তিনি ট্রাম্পের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা অনুভব করছেন। তবে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির নয়, বরং ইউক্রেনের একজন শক্তিশালী অংশীদারকে হারানোর আশঙ্কার সঙ্গেও জড়িত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই স্টারলিংক সংযোগে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে রুশ অবস্থানে হামলায় ব্যবহৃত ইউক্রেনের বেশ কিছু ড্রোনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত হামলাকারী ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সমস্যায় পড়েছে।
জেলেনস্কির ভাষ্য, রাত ১টার দিকে স্টারলিংক সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পরিণতিতে মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের তৈরি স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইউক্রেনের সামরিক প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ জানান, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা টার্মিনালগুলো হঠাৎ সংযোগ হারায়। এতে সামরিক বাহিনীর কয়েকটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বেস্ক্রেস্তনভের মতে, ঘটনাটি নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী এ বিষয়ে কোনো আগাম সতর্কতা পায়নি।
রাশিয়ার শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় স্টারলিংকনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলেও জানান এই উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, রাশিয়া ড্রোনের ইঞ্জিন উন্নত করার পর এসব ড্রোন প্রতিহত করার হার একসময় ৯০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছিল। এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের আত্মরক্ষার সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করতে পারে।
তবে স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নিজের নয় বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। তাঁর ব্যাখ্যা, অস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত গ্রাহকদের সরাসরি স্টারলিংক ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত ‘স্টারশিল্ড’ নেটওয়ার্কের একটি সংস্করণ ব্যবহার করছিল। এর গতি ও ব্যবহারসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা নির্ধারণের ক্ষমতা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে বলে মন্তব্য করেন মাস্ক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করেছে—এমন দাবি অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ভবিষ্যতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ সীমিত করা হতে পারে বলে তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের বসন্তে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। ওই বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা জেলেনস্কির হাতে নেই। বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্যোগ নিতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য। বুধবার ডাউনিং স্ট্রিটে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সামরিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।
বার্নহাম ইউক্রেনে হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রুশ ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেন। পাশাপাশি কিয়েভকে আরও সহায়তা দেওয়ার সম্ভাব্য পথগুলোও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
জেলেনস্কি ব্রিটিশ রাজার তৃতীয় চার্লসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি আলোচনায় তোলার পরিকল্পনার কথা জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
এদিকে রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। ডিজেলের উচ্চমূল্যের জন্য এসব হামলাকে দায়ী করেছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানির দামে আরও বেশি পড়েছে।
জেলেনস্কি জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া। কিয়েভ ও খারকিভে ৩৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২০টি হামলাকারী ড্রোন ছোড়া হয়। হামলায় পাঁচটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং বড় শহরগুলোর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এতে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছেন।
গত সপ্তাহে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেওয়ার আগে এ চুক্তি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।
অন্যদিকে ক্রেমলিনের দাবি, প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির আওতায় কোন কোন জ্বালানি অবকাঠামো থাকবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে রাশিয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে—এমন অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
তিনি বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির বিস্তারিত নির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই রাশিয়া তা মানছে না বলে দাবি করার সুযোগ নেই।
এমএ
