সমুদ্রের ধারে সেই ছোট্ট শিশুটি—
আয়লান কুর্দি—
যেন ঘুমিয়ে আছে আজও;
তার মুখে লেগে আছে দূর দেশের বালু,
চুলে পরশ মাখায় শীতল হাওয়ার নরম হাত—
মনে হয়, মা-বাবার আঙুল ছেড়ে
সামান্য একটু খেলতে গিয়েছিল সে—
নীল জলের কিনারায়।
কত রাত পেরিয়ে গেছে—
সমুদ্র তার ঢেউ গুনে যায়,
চাঁদ তার রুপালি আলো বিছিয়ে রাখে;
কেবল সেই শিশুটি আর উঠে দাঁড়ায় না—
তার ছোট্ট জুতোর ভেতর
হয়তো এখনো আটকে আছে
একটি অসমাপ্ত পথের ধুলো।
সে কি জানত—
মানুষের পৃথিবী এত বড়,
তবু মানুষের হৃদয় কখনো কখনো
একটি শিশুর জন্যও এত ছোট হয়ে যায়?
যে পৃথিবীতে পাখিরা সীমান্ত মানে না,
নদী পাসপোর্ট রাখে না, বাতাস কোনো দেশের নাগরিক নয়—
সেই পৃথিবীতেই মানুষ
মানুষের জন্য কঠিন সীমান্ত আঁকে।
আয়লান, তুমি কি দেখেছিলে শেষ মুহূর্তে
তোমার সামনে কোনো আকাশ ছিল?
নাকি শুধু সমুদ্র—
অন্ধকার, অনন্ত, কালোজলে ভরা?
তুমি কি মাকে ডাকতে চেয়েছিলে?
বাবার হাত খুঁজেছিলে?
নাকি ক্লান্ত শিশুর মতো
বালুর বুকে মাথা রেখে ভেবেছিলে—
‘এ পৃথিবী বুঝি ঘুমানোর জন্যই এত নরম!’
তোমার ছোট্ট দেহটি
আজ পৃথিবীর বিবেকের আয়না;
তোমার নিস্তব্ধ চোখে
দেখা যায় যুদ্ধের ধোঁয়া, শরণার্থীর দীর্ঘ পথ,
ক্ষুধার্ত মানুষের কাঁপা কাঁপা হাত,
আর সভ্যতার উঁচু প্রাসাদের
বন্ধ জানালা।
হাজার বছর পরে
যদি কোনো কবি এই পৃথিবীর কথা লিখেন,
তিনি হয়তো বলবেন—
‘আসলে সাগরের পানি মিষ্টিই ছিল,
একদিন সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে একটি শিশু মারা গেল;
মনের দুঃখে পৃথিবীর সব সমুদ্র বুকের সব জল ঝেড়ে ফেলে দিল,
আর পরক্ষণেই মানুষের চোখের নোনা পানিতে ভরে উঠল।’
আয়লান, তুমি মৃত নও—
তুমি জেগে আছো আমাদের মনের গহিনে;
আমরা যারা বেঁচে আছি
তাদের প্রত্যেকের চোখের গভীরে
তোমার ছোট্ট মুখটি
একটি নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠবে—
প্রতিদিন সন্ধ্যায়—জ্বলবে সারা রাত।
আর কোনো এক ভোরে—
ধানের শিষে শিশির নামবে,
দূরের নদী কুয়াশার ভেতর দিয়ে বয়ে যাবে,
পাখিরা অচেনা আকাশে ডেকে উঠবে;
সেদিন যদি মানুষ সত্যিই মানুষ হতে পারে,
তবে কোনো শিশুকে আর
সমুদ্রের তীরে উঠে
এভাবে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে না।
অক্টোবর ৪, ২০২৬
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
