সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাকে ঘিরে চারদিকে উৎসবের আমেজ। শেষ মুহূর্তে কোথাও মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা, কোথাও চলছে পূজার নানা প্রস্তুতি। তবে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ বাজারসংলগ্ন জেলেপাড়ার সোনামনি দাশী, বুলি দাশী ও দিপালী মণ্ডলের ঘরে উৎসবের কোনো ছোঁয়া নেই। জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বাঘ বিধবা’ হিসেবে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও উৎসব আসে, কিন্তু তাঁদের জীবনে আনন্দ ফেরে না।
গত ১৩ অক্টোবর দুপুরে সুন্দরবন-সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে অনানুষ্ঠানিকভাবে একত্র হয়েছিলেন এই নারীরা। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাঘ বিধবাদের শাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু। সেখানেই নিজেদের জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন তাঁরা। কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কেউ কেউ।
শাড়ি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত সোনামনি দাশী বলেন, ‘আমাদেরও পূজা আসে, কিন্তু আনন্দ আসে না। স্বামীকে হারানোর পর আমাদের জীবনের সব উৎসব যেন সুন্দরবনেই হারিয়ে গেছে।’
সোনামনির বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। ১৯৯৯ সালে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান তাঁর প্রথম স্বামী রাধাকান্ত সরদার। সঙ্গীরা তাঁর মরদেহও খুঁজে পাননি। তখন সোনামনির কোলে ছিল মাত্র এক মাস বয়সী সন্তান। স্বামী হারানোর পর শাশুড়ি ওই শিশুসহ তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। বাবার বাড়িতেও আশ্রয় মেলেনি। পরে দেবর ভূবেন সরদারের ঘরে ঠাঁই নেন তিনি। একপর্যায়ে ভূবেনকেই বিয়ে করেন। এতে নতুন করে বাঁচার আশাও দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আশাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ভূবেনও একসময় সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। তাঁর মরদেহও পাওয়া যায়নি।
এরপর থেকেই সোনামনির নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় ‘অপয়া’, ‘অলক্ষ্মী’ ও ‘স্বামীখেকো’ অপবাদ। তিনি বলেন, ‘কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলেও খেতে দেয় সবার শেষে।’ শাশুড়ির নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে যাতে শাশুড়িকে তাঁর মুখ দেখতে না হয়, সে জন্য তাঁকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। সোনামনির ভাষায়, ‘এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী বাঘের পেটে গেল, আমাকেও রেখে গেল মরার মতো।’
দ্বিতীয়বার বিধবা হওয়ার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজেই কাজে নামেন সোনামনি। নদীতে জাল টেনে মাছ ও কাঁকড়া ধরেছেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, ঘেরে মাটি কেটেছেন। এভাবেই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। দিন কাটে মুন্সিগঞ্জ বাজারের দোকানিদের ছোটখাটো কাজ করে। বিনিময়ে পান সামান্য চাল, ডাল ও পেঁয়াজ। সংসার কীভাবে চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার আর সংসার! একলা জীবন!’ তাঁর অভিযোগ, তাঁকে এবং আশপাশের আরও তিনজনকে সরকার থেকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি।
একই পাড়ার বুলি দাশীর জীবনেও নেমে এসেছিল একই ধরনের দুর্ভোগ। ২০০২ সালে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান তাঁর স্বামী অরুণ মণ্ডল। বুলির অভিযোগ, স্বামীকে হারানোর জন্য তাঁকেই দায়ী করে শাশুড়ি নির্যাতন করতেন। একপর্যায়ে তাঁকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। বাবা আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাই আশ্রয় নিতে হয় ভাইয়ের বাড়িতে। কিন্তু ভাইয়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। বুলি বলেন, ‘কিন্তু ভাইও তো গরিব।’ এরপর নদীতে রেণুপোনা ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এভাবেই ছেলে-মেয়েদের বড় করেছি। আজও একই কাজ করে জীবন চালাই।’
বুলি জানান, তাঁর স্বামীর ছোট ভাইও বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন। সেই ভাইয়ের স্ত্রী দিপালীকেও বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুলি বলেন, ‘আমার মতো এমন অনেক মেয়ে আছে, যাদের স্বামী বাঘের হাতে মারা যাওয়ার পর অপয়া বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
উৎসবের দিনে অন্যদের আনন্দ আর নিজেদের জীবনের কষ্টের ফারাক তুলে ধরেন ঊষা রানী। তিনি বলেন, ‘অন্যদের ঘরে পূজার আনন্দ, নতুন কাপড় আর ভালো খাবারের আয়োজন। আমাদের জীবনে শুধু অভাব আর কষ্ট। স্বামী নেই, তাই আমাদের আর কোনো উৎসব নেই।’
আলোমতির কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘স্বামী হারিয়ে সংসার চালানোর সংগ্রামেই জীবন কেটে যাচ্ছে। পূজায় নতুন শাড়ি পেয়েছি, কিন্তু স্বামীকে হারানোর শূন্যতা তো আর পূরণ হবে না। আমাদের জীবনের আনন্দ সেই সুন্দরবনেই হারিয়ে গেছে।’
শুধু মুন্সিগঞ্জেই নয়, শ্যামনগর উপকূলের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী, রমজাননগর, আটুলিয়াসহ সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে এমন শত শত নারী রয়েছেন। তাঁদের কারও স্বামী মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের শিকার হয়েছেন, আবার কেউ মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে স্বামীকে হারিয়েছেন।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে নিহত ও আহত বনজীবীর সংখ্যা ২২০। তাঁদের মধ্যে ১৮০ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়েছেন।
বেসরকারি সংস্থা লিডার্সের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১৬৩। এর মধ্যে গাবুরায় ১০৯, মুন্সিগঞ্জে ১০৭, রমজাননগরে ৪১ ও বুড়িগোয়ালিনীতে ৩৯ জন রয়েছেন। অথচ সরকারি হিসাবে স্বীকৃত বাঘ বিধবার সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন।
দীর্ঘদিন ধরে বাঘ বিধবাদের নিয়ে কাজ করছেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু। সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের এই পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মধু সংগ্রহ কিংবা মাছ ধরতে যাঁরা সুন্দরবনে যান, তাঁদের অনেকে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করেন না। কেউ কেউ অন্যের নামে নেওয়া পাস ব্যবহার করে বনে প্রবেশ করেন। এভাবে বনে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা গেলেও অনেকের নাম সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় না।
পিন্টু জানান, আগে বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হতো। বর্তমানে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে তিন লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তিকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। তবে অন্যের পাস ব্যবহার করে কিংবা অবৈধভাবে বনে প্রবেশের পর কেউ বাঘের আক্রমণে নিহত বা আহত হলে তাঁর পরিবার কোনো সহায়তা পায় না।
পিন্টুর দাবি, সাতক্ষীরা উপকূলের দেড় লক্ষাধিক মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু বলেন, সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীরা শুধু প্রিয়জনকেই হারান না, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎসও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সন্তানদের লালন-পালন ও সংসার চালাতে গিয়ে তাঁদের চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, যাঁদের আবাসনসংকট রয়েছে, তাঁদের সরকারি আবাসন সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি এসব নারীকে স্বাবলম্বী করতে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাঘ বিধবা পরিবারগুলোর সঠিক তালিকা তৈরি করে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি সহায়তার বিষয়ে সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা মো. এরফান উদ্দিন বলেন, বৈধ পাস-পারমিট নিয়ে বনে প্রবেশের পর যাঁরা বাঘের আক্রমণে নিহত বা আহত হন, তাঁদের সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হয়। তবে অবৈধভাবে বনে প্রবেশের পর কেউ নিহত বা আহত হলে তাঁকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ নীতিমালায় নেই।
এমএ
