Published on
:
2 min read
সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
ছেলের পছন্দের জামাটা রয়েছে সমাধির মধ্যে। আর পুজোর জন্যে কেনা বাকি জামাগুলো মাঝেমধ্যে বের করে কোলের মধ্যে নিয়ে তাকিয়ে থাকছেন অপলক দৃষ্টিতে। চার বছরের শিশু অরণ্যের মৃত্যুর পরে চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে মা শিল্পা রায়ের। অকল্পনীয় একটা রাতারাতি পাল্টে দিয়েছে পরিবেশ। বিষাদের দীর্ঘ ছায়ায় যেন আচ্ছন্ন বাড়ি লাগোয়া বারোয়ারি দুর্গাপুজোতে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, গতবার থেকেই ছোট্ট ছেলেটা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছিল পুজোর আনন্দ। কিন্তু সেটাই তো শেষ হয়ে গেল অকালে!
জন্মের পর থেকে মন্তেশ্বরের পশ্চিম খরমপুরে মামার বাড়িতে পুজো কেটেছে অরণ্যের। বাড়ি লাগোয়া বারোয়ারি পুজোর প্যান্ডেলের তৈরি বাঁশ লাগানোর পরে দিনরাত সেখানেই খেলে বেড়িয়েছে অরণ্য। সে–ই আজ নেই! ছেলেকে নিয়ে কিছু বলতে গেলেই গলা কেমন যেন বুজে আসে বাবা জয়ন্ত রায়ের। নিজেকে সামলে নিয়েই বললেন, ‘গত বছরেও তো সপ্তমীর বিকেলে মোটরবাইকে আমরা তিন জন ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম বর্ধমানে। কত আনন্দ করল! কত ছবি তোলা হলো! এ বারও ঠিক ছিল বর্ধমানে যাওয়ার। তাই ভাবলাম, পুজোর আগে ছেলেটার ফাইমোসিসের অপারেশনটা করিয়ে নিই। পুজোর সময়ে ও সুস্থ হয়ে যাবে। আমরা আরও বেশি আনন্দ করব।’ একটু থেমে যোগ করেন, ‘পুজোর পর আমাদের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের রামজীবনপুরের দেওপুর গ্রামে সবাই ফিরে যাব। সব শেষ হয়ে গেল!’
বাড়ির একেবারে গায়েই বারোয়ারিতলা। সেই পুজোয় একবারের জন্যও পা রাখেননি অরণ্যর দিদিমা উমা হুই। দাদু উজ্জ্বল হুই ধরাগলায় বললেন, ‘এ বারের পুজো পাঁচ দিনের। কিন্তু আমাদের কাছে পুজো তো শেষ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই পুজোটাও এক দিনে শেষ হয়ে যাক।’ পাড়ায় পুজো। কিন্তু মন ভালো নেই প্রতিবেশী চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজু চট্টোপাধ্যায়দের। কারণ, এ বার তো তাঁদের প্রিয় সঙ্গী ‘ঘন্টু’ তো নেই! চন্দন, রাজুরা যে এই নামেই ডাকতেন ছোট্ট অরণ্যকে। মা শিল্পা বললেন, ‘জানেন, ওই অপারেশনের আগে ভাতার থেকে ওর জামাকাপড় কেনা হয়ে গিয়েছিল। সবথেকে পছন্দের জামাটা ওর সমাধির ভিতরে রয়েছে।’ কেমন যেন আনমনা হয়ে যান শিল্পা। স্বগতোক্তির মতো বলে যেতে থাকেন, ‘ছেলেটা আমার থেকে শুনে শুনে হনুমান চালিসা, মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র মুখস্থ করে ফেলেছিল। আমাদের বাড়ির সামনে তিনটে মন্দির রয়েছে। ও স্নান করে গামছা পরে ছুটে প্রণাম করতে চলে যেত সেখানে। মনে হতো, যেন ঈশ্বরের দূত হয়ে এসেছে।’ যোগ করেন, ‘আর যেন কারও এ ভাবে মৃত্যু না–হয়! অরণ্য নিজের জীবন দিয়ে চিনিয়ে দিয়ে গেল ভুয়ো ডাক্তারদের!’
নার্সিংহোমের মালিক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবির আহমেদ এখনও অধরা। তাঁরা কবে ধরা পড়বেন? শিল্পা বলেন, ‘তা তো বলতে পারব না। তবে বিচারের আশায় বসে আছি। যতদিন না–ওদের উপযুক্ত শাস্তি হচ্ছে, কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। আর সেটা না–হলে নিজের ফাঁসির আবেদন করব। যদি সন্তানকে ন্যায্য বিচার না–দিতে পারি, তা হলে আমি কেমন মা! এমন মা হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।’