নিক ম্যাডিনসনের ওপর যেন পাহাড় চেপে বসেছিল। তার দল নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে এমনিতেই ছিল তুমুল সমালোচনা। এরপর প্রায় ১০ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে তিনি নাম লেখান অনাকাঙ্ক্ষিত এক শূন্যের রেকর্ডে! পরের ইনিংসে প্রথম বলেই বাউন্ডারি মারার পর সেই পাহাড় সরে যায় তার ওপর থেকে। এরপর বেশ আগ্রাসী এক ইনিংস উপহার দেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত ডারবান টেস্টে এই দুইরকম স্বাদ পান ম্যাডিনসন। ২০১৬ সালে তিনটি টেস্ট খেলে বাদ পড়ার পর এই প্রথম টেস্ট খেলতে নামে তিনি। তাকে দলে নেওয়া নিয়েও ছিল তুমুল সমালোচনা।
অণ্ডকোষের ক্যান্সার কাটিয়ে গত মৌসুমে ক্রিকেটে ফিরলেও তখনও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফেরা হয়নি তার। লাল বলের ক্রিকেট খেলেননি ১৯ মাস ধরে। সবশেষ যে মৌসুমে খেলেছেন, সেখানেও তার পারফরম্যান্স ছিল বাজে। সেই ব্যাটসম্যানকে আচমকাই নেওয়া হয় টেস্ট দলে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের বাস্তবতায় যা অবিশ্বাস্য।
শুধু স্কোয়াডেই রাখা হয়নি, ৩৪ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানকে একাদশেও রাখা হয়। কিন্তু ফেরার টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৩৩ বলে শূন্য করে আউট হন তিনি। মার্কো ইয়ানসেনের বল কাট করার চেষ্টায় টেনে আনেন স্টাম্পে। অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দেড়শ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বল খেলে শূন্যের রেকর্ড এটি। পেছনে পড়ে যায় ১৯৮১ সালে মাইক হুইটনির ৩২ বলে শূন্য রান। ওপেনারদের মধ্যে রেকর্ডটি ছিল ডেভিড ওয়ার্নারের ২২ বলে শূন্য।
পরে দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাডিনসন মাঠে নামেন প্রবল চাপকে সঙ্গী করে। এবার ইনিংসের প্রথম বলে সেই ইয়ানসেনকেই চার মেরে উড়িয়ে দেন চাপ। এরপর আরও কিছু দারুণ শটে ৩৮ বলে ৪৮ রানের ইনিংস খেলেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
টেস্ট শেষে কায়ো স্পোর্টসে ম্যাডিনসন বলেন, ওই বাউন্ডারি ছিল তার জন্য বিশাল স্বস্তির।
“(দ্বিতীয় ইনিংসে) ক্রিজে গিয়ে ভাবছিলাম, ‘বল যেখানেই হোক, আমাকে ব্যাট চালাতেই হবে’ এবং সৌভাগ্যবশত, প্রথম বলেই দীর্ঘদেহী ওই বোলারের (ইয়ানসেন) কাছ থেকে একটি আলগা ডেলিভারি পেয়েছিলাম। সে কিছুটা আঁটসাঁট ছিল এবং পরিস্থিতি সহজ করার জন্য বাউন্সার দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে আমার জন্য তা বিরাট স্বস্তির ব্যাপার ছিল।”
প্রথম ইনিংসের পর তাকে ঘিরে সমালোচনা হয়েছিল তুমুল। তবে সতীর্থ ও কাছের মানুষদের পাশে পেয়ে তিনি ছিলেন রোমাঞ্চিত।
“কিছু নেতিবাচক মন্তব্য হয়েছে বটে। তবে আমাদের দলের মধ্যে, রাজ্য দলের অনেকের কাছ থেকে এবং বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকেও যে সমর্থন পেয়েছি, বেশিরভাগই ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। সেই সমর্থনটাকেই কাজে লাগিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করেছি এবং কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম। এই কাজটা তো অনেক দিন ধরেই করে আসছি। এখন শুধু এই পর্যায়ে এসে সেটিকে ঠিকঠাকভাবে প্রয়োগ করার পালা।”
৩৩ বলে শূন্য রানের পর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও। তিনি তো শুধু অস্ট্রেলিয়ার কোচ নন, নির্বাচক কমিটির সদস্যও। তার মতে, প্রথম ইনিংসেও খুব খারাপ খেলেননি ম্যাডিনসন।
“তার প্রথম ইনিংস নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। যদিও সে ভালোভাবে বল ছেড়ে দিচ্ছিল। বোলারদের জন্য উইকেটে অনেক সহায়তা ছিল। (আউট হওয়া ডেলিভারিতে) সে এমন একটা বলে খেলার চেষ্টা করছিল, আগের তিরিশের বেশি বলে যে ধরনের ডেলিভারি সে ছেড়ে দিয়েছে। সময়টা কঠিন ছিল এবং আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত সে যেভাবে খেলছিল, ওই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সেটাই সঠিক উপায় ছিল।
“একজন পরিণত ক্রিকেটার খেলাটা ভালোভাবে বোঝে। দ্বিতীয় ইনিংসে পরিস্থিতিটা কিছুটা ভিন্ন ছিল। উইকেটটি ছিল তুলনামূলক সহজ এবং সম্ভাব্য আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে বোর্ডে দ্রুত রান তুলতে হতো আমাদের। তাই আমার মনে হয়েছে, সে দুটো পরিস্থিতিতেই বেশ ভালোভাবে খেলেছে। যদিও প্রথমটা ঠিক সেভাবে হয়নি যেভাবে সে সবসময় চেয়েছিল। দ্রুত এবং ধীর, উভয় গতিতেই খেলতে পারে সে।”
ম্যাডিনসনকে দলে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনাগুলোর জবাবও দিলেন ম্যাকডোনাল্ড।
“আমরা তাদের খেলার ধরণ, রান করার ধরন, বোলিং আক্রমণ এবং প্রতিপক্ষকেও দেখি। তাই আমরা এই সবকিছু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। এর মধ্যে কোনো ঠিক বা ভুল নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করি, বিষয়টি মূলত তারই ওপর নির্ভরশীল।
“যদি বিশেষভাবে নিক ম্যাডিনসনের বিষয়ে কথা বলতে চান, আমরা মনে করি যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি, বিশ্বজুড়ে আমাদের দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে প্রয়োগ করে এসেছি, তার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।”
