বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, পাল্টে যাচ্ছে রাজনৈতিক ভাষা, সামাজিক সম্পর্ক ও আদর্শিক অবস্থানের হিসাবও। একদিকে সংস্কার, গণতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহনন এবং উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশ কি সত্যিই উগ্র ডানপন্থার দিকে এগোচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘উগ্র ডানপন্থা’র বয়ানই হয়ে উঠছে নতুন অস্ত্র?
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, বিএনপিবিরোধিতার রাজনীতি করতে গিয়ে সেকুলার সমাজের একাংশ জামায়াত-শিবিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল মবের চাপ অনেককে ডানপন্থা থেকে উগ্র ডানপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জামায়াত-শিবির রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে, আর দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথও তৈরি হতে পারে।
মাহফুজের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তিনি শুধু একটি দলের উত্থান নিয়ে কথা বলেননি; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে আদর্শিক মেরুকরণ, কৌশলগত মিত্রতা এবং সামাজিক চাপের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাঁর আশঙ্কাকে বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বক্তব্য আর প্রমাণিত প্রবণতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ সত্যিই উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে কি না, তার উত্তর খুঁজতে হলে স্লোগানের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের বাস্তব গতিপথ।
রাজনীতির সুবিধাবাদ, না আদর্শিক পরিবর্তন? বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা রয়েছে, প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে আদর্শিকভাবে দূরের শক্তির সঙ্গেও কৌশলগত বোঝাপড়া। কখনো ক্ষমতার জন্য, কখনো নির্বাচনী হিসাবের কারণে, কখনো আবার কোনো একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ঠেকানোর তাগিদে তৈরি হয় সাময়িক মিত্রতা। কিন্তু এমন মিত্রতার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে সেকুলার সমাজের একাংশ জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণে সহায়তা করছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা নিছক দলীয় কৌশলের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই অভিযোগ যাচাই করতে হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ দেখতে হবে। কারও বিএনপিবিরোধী অবস্থান মানেই তিনি জামায়াতের মিত্র, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিসংগত নয়।
একইভাবে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা আর দলটির প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উগ্রবাদ হিসেবে চিহ্নিত করাও এক কথা নয়। জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল, শিবির তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আদর্শের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর; ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতার ভিত্তিতে ঢালাও অভিযোগ নয়।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ, ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ, রক্ষণশীল ভোটার এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের অনুসারীরা একই শ্রেণির নন। তাঁদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করালে প্রকৃত উগ্রবাদ চিহ্নিত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় দূরত্বও তৈরি হয়।
রাজনীতিতে মেরুকরণ যত বাড়ে, ততই এই পার্থক্যগুলো মুছে ফেলার প্রবণতা দেখা দেয়। অথচ বাংলাদেশের প্রয়োজন ঠিক এর বিপরীত। কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি অন্যের অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানকে কতটা সম্মান করেন।
ডানপন্থা আর উগ্র ডানপন্থা এক নয়: ‘ডানপন্থা’ শব্দটি রাজনৈতিক আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ সর্বত্র এক নয়। রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ কিংবা ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য, এসবের কোনো একটি বা একাধিক উপাদান ডানপন্থী রাজনীতিতে থাকতে পারে। এগুলো নিজেরাই উগ্রবাদের প্রমাণ নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন কোনো মতাদর্শের নামে ভিন্নমত দমন করা হয়, সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার অস্বীকার করা হয়, নারীর স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধীদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে পরিস্থিতি, যখন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংসতা, ভয়ভীতি, জবরদস্তি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়।
সুতরাং বাংলাদেশ উগ্র ডানপন্থার দিকে এগোচ্ছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি বাস্তব সূচক দেখতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা কতটা নিরাপদ? নারীর অধিকার ও শিক্ষার স্বাধীনতা নিয়ে সামাজিক চাপ বাড়ছে কি না? রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মতভিন্নতার কারণে মানুষ আক্রমণের শিকার হচ্ছে কি না? অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ করছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া ‘দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে’! এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বিশ্লেষণ হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অবশ্য উদ্বেগের কারণ নেই, এমন দাবিও করা যাবে না। কোনো সমাজে যখন যুক্তির পরিবর্তে পরিচয়, সহনশীলতার পরিবর্তে শত্রুতা এবং আইনের পরিবর্তে জনতার চাপ গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন উগ্রতার বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ে। এই প্রবণতা ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালেই দেখা দিতে পারে।
ডানপন্থা আর উগ্র ডানপন্থা এক নয়। ‘ডানপন্থা’ শব্দটি রাজনৈতিক আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ সর্বত্র এক নয়। রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ কিংবা ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য, এসবের কোনো একটি বা একাধিক উপাদান ডানপন্থী রাজনীতিতে থাকতে পারে। এগুলো নিজেরাই উগ্রবাদের প্রমাণ নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন কোনো মতাদর্শের নামে ভিন্নমত দমন করা হয়, সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার অস্বীকার করা হয়, নারীর স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধীদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে পরিস্থিতি, যখন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংসতা, ভয়ভীতি, জবরদস্তি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়।
সুতরাং বাংলাদেশ উগ্র ডানপন্থার দিকে এগোচ্ছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি বাস্তব সূচক দেখতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা কতটা নিরাপদ? নারীর অধিকার ও শিক্ষার স্বাধীনতা নিয়ে সামাজিক চাপ বাড়ছে কি না? রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মতভিন্নতার কারণে মানুষ আক্রমণের শিকার হচ্ছে কি না? অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ করছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া ‘দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে’—এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বিশ্লেষণ হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অবশ্য উদ্বেগের কারণ নেই, এমন দাবিও করা যাবে না। কোনো সমাজে যখন যুক্তির পরিবর্তে পরিচয়, সহনশীলতার পরিবর্তে শত্রুতা এবং আইনের পরিবর্তে জনতার চাপ গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন উগ্রতার বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ে। এই প্রবণতা ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালেই দেখা দিতে পারে।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যে ডিজিটাল মব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ আক্রমণের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর নিছক মতামত প্রকাশের জায়গা নয়। এটি জনমত গঠন, রাজনৈতিক প্রচার, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র।
কোনো ব্যক্তি একটি বক্তব্য দিলেন। মুহূর্তেই তাঁর পুরোনো পোস্ট খুঁজে বের করা হলো, বক্তব্যের অংশবিশেষ ছড়িয়ে পড়ল, শুরু হলো গালাগাল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। কখনো যাচাইহীন অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো, কখনো কাউকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে আটকে দেওয়া হলো। এভাবে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় ভয়, আত্মপক্ষ সমর্থনের চাপ এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা।
এর পরিণতি বিপজ্জনক। কেউ হয়তো নিজের বিশ্বাসের কারণে নয়, বরং অনলাইন আক্রমণ এড়াতে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর ভাষা গ্রহণ করেন। কেউ নীরব হয়ে যান। কেউ আবার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে নিজের অবস্থান নিরাপদ করার চেষ্টা করেন। এভাবেই জনপরিসরে চরম অবস্থান স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে ডিজিটাল মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অর্থ জনমতের সমালোচনা বন্ধ করা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের জবাবদিহি চাইবেন, ভুলের প্রতিবাদ করবেন, সমালোচনা করবেন। এটাই স্বাভাবিক। সীমারেখাটি হলো, সমালোচনা যেন হুমকি, মিথ্যা তথ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কিংবা সহিংসতায় উসকানিতে পরিণত না হয়।
এখানে রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবারই দায়িত্ব রয়েছে। ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখার সংস্কৃতি কমাতে না পারলে উগ্রতার বিরুদ্ধে লড়াইও শেষ পর্যন্ত আরেক ধরনের উগ্রতার জন্ম দিতে পারে।
উগ্রবাদের আশঙ্কা: বাঘের গল্প ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই! রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) বাংলাদেশে সক্রিয় সেল বা সাংগঠনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ১০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত আঞ্চলিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। সংগঠনটি ছোট ও বিকেন্দ্রীভূত সেলের পাশাপাশি যোগাযোগ, রসদ ও অর্থায়নের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনটির সেল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তবে এই মূল্যায়নকে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কার্যকর একিউআইএস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম প্রতিবেদন।
এখানে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশের পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে একিউআইএসের সেল প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন এবং জানান, প্রতিবেদন না পড়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। প্রথমত, জাতিসংঘের সতর্কতাকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক হবে না। দ্বিতীয়ত, দেশে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সেলের তথ্য প্রকাশ্যে নেই বলে সম্ভাব্য হুমকিকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।
একিউআইএস ২০১৪ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের কর্মকাণ্ড বিস্তারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশেও অতীতে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি তৎপরতার ইতিহাস রয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সতর্কতাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সংবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জঙ্গিবাদের কৌশলও বদলেছে। একটি বড় প্রশিক্ষণশিবির, দৃশ্যমান নেতৃত্ব কিংবা বিপুলসংখ্যক সদস্য না থাকলেও ছোট ছোট গোপন ইউনিটের মাধ্যমে সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। অনলাইন প্রচারণা, বিচ্ছিন্ন সদস্যদের যোগাযোগ এবং গোপন অর্থায়নও এ ধরনের সংগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সতর্কতা আর আতঙ্ক এক জিনিস নয়। গোয়েন্দা তথ্য যাচাই, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের আইনসম্মত অনুসন্ধান, আন্তর্দেশীয় সহযোগিতা এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই এখানে কার্যকর পথ। কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আবার রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি তদন্তের বাইরে রাখাও চলবে না।
জঙ্গিবাদের প্রশ্নে রাষ্ট্রের কাজ বাঘের গল্প বলে আতঙ্ক ছড়ানো নয়, আবার বাঘ নেই বলে চোখ বন্ধ করে থাকাও নয়। কাজ হলো, বাঘের অস্তিত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং বিপদ দেখা দিলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যে ফিরে আসা যাক। তাঁর আশঙ্কা, জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক প্রভাব যত বাড়বে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে। এই বক্তব্যের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো বাস্তবতার ইঙ্গিত রয়েছে, একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান অন্য শক্তির পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে কোনো দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্য দলের ভুলের ওপরই নির্ভর করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, অতীতের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি, সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং জনগণের আস্থার ওপর। একইভাবে বিএনপি কিংবা জামায়াতের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে তাদের রাজনৈতিক আচরণ, কর্মসূচি ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে।
একটি বিষয় পরিষ্কার: কোনো দলকে ঠেকানোর নামে আরেকটি দলের অগণতান্ত্রিক আচরণকে প্রশ্রয় দিলে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ যে শক্তিকে কৌশলগত কারণে ব্যবহার করা হচ্ছে, কাল সেই শক্তিই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর তাই নিজেদের স্বল্পমেয়াদি লাভের বাইরে তাকানো দরকার। সংস্কারের নামে প্রতিপক্ষকে বাদ দেওয়া, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো কিংবা সাংস্কৃতিক বিতর্ককে অন্তহীন সংঘাতে পরিণত করা, কোনোটিই স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ককে শুধু কে জিতবে আর কে হারবে? এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রটি কোন নীতিতে পরিচালিত হবে, নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং ভিন্নমতের মানুষ কতটা নিরাপদে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে পারবেন।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যকে তাই একদিকে রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে, অন্যদিকে তাঁর ব্যবহৃত ভাষা ও সিদ্ধান্তগুলোকেও প্রমাণের আলোকে যাচাই করা দরকার। তাঁর আশঙ্কা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মেলে, তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক আচরণ, সামাজিক প্রবণতা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের তথ্য, কোনো ব্যক্তির ঘোষণা নয়।
একইভাবে একিউআইএস নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচারের উপকরণ বানানো যাবে না। নিরাপত্তা ও রাজনীতি একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে; তবু তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড আলাদা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কেবল ডানপন্থার উত্থান ঠেকানো নয়। চ্যালেঞ্জ হলো, যে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে কর্তৃত্ববাদ, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিস্তার রোধ করা। একই সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে কি না, তার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় হয়তো এখনো আসেনি। কিন্তু সেই ট্রেনের ঝুঁকির সংকেতগুলো উপেক্ষা করারও অবকাশ নেই। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দোষারোপের চেয়ে আত্মসমালোচনা বেশি জরুরি, আর নিরাপত্তার প্রশ্নে অনুমানের চেয়ে প্রমাণের মূল্য বেশি।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না কে কাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে পারল। নির্ধারণ করবে, রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা দৃঢ়ভাবে অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা এবং উগ্রবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে পারল, কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ছাড়াই।
বাঘের গল্প বলে মানুষকে ভয় দেখানো যেমন অনুচিত, তেমনি বাঘের পদচিহ্ন দেখেও হাসাহাসি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় সত্য যাচাই, সময়মতো সতর্কতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। বাংলাদেশের রাজনীতিরও এখন ঠিক এই পরিপক্বতাটুকুই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
