
জ্বালানি খাত এখন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা এবং বিদেশে ডলার পাচারের মতো গভীর সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে।
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘Sustainable Power and Energy: Driving Investment in Bangladesh’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্বাভাবিক ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায় সরকার।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে তিন থেকে চারটি নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ উদ্যোগে কোরীয়, চীনা ও মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটের উপযোগী একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে একটি জ্বালানি হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু। তাঁর মতে, এর ফলে নীতি প্রণয়নে স্বার্থের সংঘাত কমবে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠনের পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, হংকংয়ের পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট ইকুইটি ফান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড খাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসবে বলে সরকার আশাবাদী।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে উঠবে। এরপর অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং পর্যায়ক্রমে প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভায় প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিস শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক।
এ ছাড়া এফআইসিসিআইয়ের প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
