মেহেরপুর প্রতিনিধি।।
খৈল, বাঁশ ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব ধরনের উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বাড়লেও সেই তুলনায় পানের দাম না পাওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন মেহেরপুরের পানচাষিরা। এর ওপর ক্রেতা সংকট এবং বিদেশে পান রপ্তানি বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত কৃষকরা অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের বরজ ছোট করে ফেলছেন। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
মেহেরপুর সদর উপজেলার নুরপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের পানচাষি ৭০ বছর বয়সী জিন্নাত আলী জানান, আগে প্রতি পোন (৮০টি) পান ১১০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। অথচ পানের বরজ পরিচর্যার প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম ও শ্রমিকের মজুরি এখন বহুগুণ বেশি। এক সময় তার তিন বিঘা জমিতে বরজ থাকলেও লোকসানের কারণে তা কমিয়ে বর্তমানে মাত্র ১২ কাঠায় নামিয়ে এনেছেন।
আরেক চাষি কেসমত আলী জানান, গত বছর যে মোটা পান প্রতি পোয়া ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার তা মাত্র ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া হাটে পর্যাপ্ত ক্রেতা না পাওয়ায় অনেক সময় পান বিক্রি করতে না পেরে অবিক্রীত পান ফেলে রেখেই বাড়ি ফিরতে হয়। অপর চাষি আলমগীর হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে পান চাষ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হলেও বর্তমান বাজারে তা তোলার কোনো উপায় নেই। অনেক সময় উৎপাদিত পান বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার টাকাও থাকে না।
কেন বাড়ছে উৎপাদন খরচ?
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় প্রতিটি উপকরণের দাম হু হু করে বেড়েছে। বর্তমান বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খৈলের দাম প্রতি কেজি ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩ টাকা। ৮০ পিস বাঁশের শলির দাম ২২০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ টাকায়। টিএসপি সারের দাম প্রতি কেজি ২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৫ টাকা। তারের দাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২৫ টাকা। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে শ্রমিকের মজুরি; দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন দিতে হচ্ছে ৭০০ টাকা।
রপ্তানি জটিলতা ও বাজার সংকোচন:
স্থানীয় পান ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সময় মেহেরপুরের পান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হতো এবং ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদেশে পান রপ্তানি বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত থাকায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও আগের মতো নিয়মিত পান কিনতে পারছেন না। ব্যবসায়ী বাদশা ও সাইফুল ইসলাম উভয়েই মনে করেন, রপ্তানির বাজার পুনরায় চালু করা গেলে পানের চাহিদা বাড়ত এবং কৃষকরাও তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পেতেন।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য:
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শাহনেয়াজ জানান, বর্তমানে জেলায় ১৫৩ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। পান চাষের মান ও উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন একই স্থানে বরজ থাকলে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হতে পারে বিধায় বরজের পরিচর্যা ও স্থান পরিবর্তনের বিষয়েও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
