রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরবর্তী ধাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকের ফলাফল এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
জেলেনস্কি বলেন, ওয়াশিংটন ও কিয়েভের প্রতিনিধিদলের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার হামলার পরিস্থিতি এবং ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অংশীদার দেশগুলোকে অবহিত করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিয়েভ আন্তরিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ফল অর্জনে প্রস্তুত। শক্তিশালী অবস্থান ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে শান্তির পথ সুগম হতে পারে।
জেলেনস্কির এ বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধের অবসান চান। অন্যদিকে, ইউক্রেনের অবস্থান হলো—রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকায় দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজছে কিয়েভ। তবে কোন শর্তে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে, সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ডে ইউক্রেনের প্রবেশাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, রাশিয়ার গভীরে হামলার কাজে এ ব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়ে কিয়েভের অনুরোধ বিবেচনাধীন। অন্যদিকে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইউক্রেনের পক্ষ থেকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের সমালোচনা করেছেন।
এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে আলোচনার অগ্রগতি কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ভলিন অঞ্চলে রুশ হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। দেশের অন্যান্য এলাকায় হামলায় আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রুশ হামলায় এক নারী নিহত এবং ছয় বছর বয়সী একটি শিশু আহত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে ইউক্রেনের বড় ধরনের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে একটি তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। দুই দেশের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও স্থায়ী সমঝোতার পথে বড় বাধা রয়ে গেছে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, সামরিক সহায়তা, ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিরোধ এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনা চলার পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
The post যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে ইউক্রেন appeared first on ভোরের চেতনা.
