কুষ্টিয়ায় ব্যস্ত কুটির শিল্পোদ্যোক্তারা। বাঁশ ও কাঠের দ্বারা তৈরী একতারা, লালন ভাস্কর্য্যসহ বিভিন্ন প্রকার কুটির শিল্পের চাহিদা ব্যাপক। ঢাকা, সিলেট, রংপুর, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় এসব মালামালের চাহিদা প্রচুর। তবে চাহিদা থাকলেও অর্থাভাবে ঠিকমত যোগান দিতে পারছেনা কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার উদ্যোক্তারা। একদিকে অর্থের অভাব,অপরদিকে কুটির শিল্পের তৈরি তৈষসপত্রের উপকরনের অভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন এ ব্যবসায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জানান তাদের সহযোগিতা করলে তারা এ পেশার আরোও উন্নতি করতে পারবেন। জেলার চাহিদাপূরন করে বাইরে পাঠানো যাবে।
কুষ্টিয়ার কয়েক জন কুটির শিল্পোদ্যোক্তাদের সাথে কথা বললে জানান। বাঁশ, কাঁঠসহ গাছের বাকল দিয়ে তৈরী করা হচ্ছে একতারাসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য্য। উদ্যোক্তারা রিতিমত হিমশিম খাচ্ছেন মালের যোগান দিতে। চাহিদা থাকলেও অর্থের অভাবে যোগান দিতে পারছেননা।
কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজারের হোটেল প্রীতমের পূর্বে গড়ে উঠেছে স্বপ্না কুটির শিল্প। এর উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে কুটির শিল্পের কাজ করে আসছেন। বাড়ির উপরেই গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটি। ২ জন সহযোগী নিয়ে নিজেই কাজ করে থাকেন। সামগ্রী তৈরী হলে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে থাকেন।
স্বপ্না কুটির শিল্প’র উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম আরো জানান, সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে অনেক। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন অনেক কম হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, অর্থসংকটের কারণে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা। সরকারীভাবে সুদবিহীন ঋণ পেলে প্রতিষ্ঠানটি আরো বড় করা সম্ভব হতো। তাতে চাহিদামত উৎপাদন সম্ভব হতো। এজন্য তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
এদিকে একই এলাকায় গড়ে উঠেছে ইমরান কুটির শিল্প। এর উদ্যোক্তা ইমরান শেখ। এখানে একতারা তৈরীসহ কুটির শিল্পের কাজ করেন আব্দুল মালেক, নূরজাহানসহ আরো শিল্পীরা।
আব্দুল মালেক জানান, তিনি ১৮ বছর ধরে কুটির শিল্পের কাজ করে চলেছেন। দিন দিন একতারাসহ কুটির শিল্পের তৈরী মালামালের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন দিনে ১শ পিছ একতারা তৈরী সম্পন্ন কলেও আরো বেশি উৎপাদন করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া শহরের ছেঁউড়িয়া এলাকার সামাদ শেখ । তিনি বাড়িতেই ছোটখাটো একটি কুটিরশিল্প গড়ে তুলেছেন। নাম দিয়েছেন ‘কর্মরত কারুশিল্প’। তার এ প্রতিষ্ঠানে আরো ১০ জন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ি, বাটাল, কাঁচি দিয়ে কাজ করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সামাদ শেখ ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন বিভিন্ন আকৃতির চামড়া কাটছেন। পাশে বসে ছোট ছেলে ইমরান শেখ ও ছেলের স্ত্রী নূরজাহান খাতুন একতারায় রং দিচ্ছেন। পাঁচজন শ্রমিক একতারায় নকশা, বাঁশের ছোর, কান ও মুঠো তৈরিতে ব্যস্ত।
সামাদ শেখ জানান, একতারা তৈরির মূল উপাদান বাঁশ ও কাঠ। একতারার কাঠের খোলগুলো যশোরের কেশবপুর থেকে আমদানি করা হয়। আর ঝিনাইদহ এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার শেখপাড়া এলাকা থেকে বাঁশ আমদানি করা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় কৃষকদের কাছে থেকে লাউয়ের বস, নারকেলের মালা কেনা হয়। সেই সঙ্গে নাটোর থেকে চামড়া কেনা হয়। একতারা তৈরিতে কারিগররা হাতুড়, বাটাল, কাঁচিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়।
ইমরান শেখ জানান, ‘কুটিরশিল্প’ নামে ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমি মার্কেটে তার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুয়াকাটা, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন নগরে তাদের তৈরি এসব একতারা ও লালনের কাঠের খোদাই করা প্রতিচ্ছবি পাইকারি বিক্রি করা হয়।
নূরজাহান খাতুন জানান, দ্রুত কাজ তোলার জন্য তিনি নিজেও কাজ করেন। বেশির ভাগ সময় একতারায় রঙের কাজ করে থাকেন। কাজের চাপ হওয়ায় সহযোগিতা করে থাকেন। তবে এখানে শুধু একতারা নয়, দোতারা, ডুগডুগি, লালন সাঁইজির মুখম-লসহ কুটির শিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হয়। এসব পণ্য পাইকারি এবং খুচরা বিক্রি করা হয়।
এ এলাকায় ইমরান, সাইফুল, আমজাদের মতো এমন আরো অনেক পরিবারের সদস্যরা কুটির শিল্পের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে থাকেন। তারাও স্বাবলম্বী হচ্ছেন ওই সব পণ্য সামগ্রী তৈরি করে।
তবে কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, কুটির শিল্পে তৈরি একতারা, দোতারাসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করার উপকরন পাওয়া খুব কষ্ট হচ্ছে। নারকেলের মালই, কদুর বসসহ বিভিন্ন উপকরণের অভাবে কুটির শিল্পে মালামাল তৈরি করতে চরম হিমসিম খাচ্ছে।
ইমরান কুটির শিল্পোদ্যোক্তা ইমরান শেখ টুটুল জানান, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। সরকারীভাবে সহয়তা পেলে এ শিল্পটিকে আরো এগিয়ে নেয়া সম্ভব এজন্য তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
লালনের অনেক ভক্তরা জানান, লালনের গান আর একতারার টুংটাং সুরে ভক্ত-অনুসারীরা খুঁজে পান অমৃতের সন্ধান। ভক্তদের তৃষ্ণা মেটাতে কুষ্টিয়া ছেঁউড়িয়া, বড়বাজার, ঘোড়ারঘাট, আদর্শপাড়া ও আশপাশের কারিগররা একতারা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন দেশীয় ঐতিহ্য রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
অপরদিকে কুষ্টিয়া লালন শাহের মাজারের আশেপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু কুটির শিল্প। যেখানে লালনের একতারাসহ কাঠে বিভিন্ন তৈজষপত্র তৈরি করা হয়। নারকেলের ওড়ং, কাঠের ফিড়াসহ হরেক রকমের তৈজপত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। লালন মেলা উপলক্ষে এসব তৈজষপত্রে চাদিা বেড়ে যায় বহু গুণে। লালনের মাজারের আশেপাশে কুঠির শিল্পের এসব মালামালের গ্রামীন মেলা বসে। সেখানে প্রচুর বিক্রি হয় এসব মালের। এগুলো জেলার চাহিদা পূরণ করে বাইরে পাঠানো হয়।
