চিঠির পাতায় প্রিয়জনের জন্য জমে থাকা কথা, পুরোনো স্মৃতি আর না বলা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে অনুষ্ঠিত হলো ‘চিঠি উৎসব’।
ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে হাতে লেখা চিঠির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে এ আয়োজন করা হয়। বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে কুমিল্লা ডাক বিভাগের আয়োজনে গত রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মঙ্গলবার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
কুমিল্লা ডাক বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, তরুণ প্রজন্মকে চিঠি লেখার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি স্পিড পোস্ট ও পার্সেলের মতো আধুনিক ডাকসেবা সম্পর্কে জানানোই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নিজের হাতে চিঠি লিখে ডাকযোগে প্রিয়জনের কাছে পাঠানোর সুযোগ। স্বল্প খরচে বিশেষ ডাকসেবার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও কাছের মানুষের উদ্দেশে লিখেছেন মনের কথা। ছোট্ট এক টুকরা কাগজে উঠে এসেছে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, অভিমান আর দীর্ঘদিন ধরে বলতে না পারা অনুভূতি। তাৎক্ষণিক ডিজিটাল বার্তার বাইরে গিয়ে কাগজ-কলমে নিজের কথা প্রকাশের অভিজ্ঞতা শি দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি করে বিশেষ আগ্রহ।
উৎসবে ঘুরতে এসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেসমিন নূরের কাছে চিঠি উৎসব ছিল পুরোনো এক ঐতিহ্যকে নতুন করে জানার সুযোগ। “একসময় দূরে থাকা প্রিয়জনের খবর পেতে দিনের পর দিন ডাকপিয়নের অপেক্ষা করতেন মানুষ। চিঠির খাম খুলে পরিচিত হাতের লেখা দেখা, জমে থাকা কথা পড়া কিংবা উত্তরের অপেক্ষায় থাকার মধ্যে ছিল আলাদা আনন্দ। মোবাইল ফোন ও তাৎক্ষণিক বার্তার যুগে সেই অপেক্ষা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে মনের কথা প্রকাশ করতে পেরে তাঁর কাছে ফিরে আসে চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ ও স্মৃতির অনুভূতি।“
উৎসবে চিঠি লেখা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতি প্রকাশেরও উপলক্ষ। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম প্রয়াত দাদাকে স্মরণ করে একটি চিঠি লেখেন। অন্যদিকে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা তাঁর ২৩ বছরের বিবাহিত জীবনে স্ত্রীকে সরাসরি বলতে না পারা কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার কথাগুলো তুলে ধরেন চিঠির পাতায়।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “এতদিন ধরে আমরা সংসার করছি। ভাবছিলাম, আমার স্ত্রীকে জানাই, আমি তাঁর কাছে কতটা কৃতজ্ঞ। কখনো সেটা বলা হয়ে ওঠেনি। আজকের এই চিঠি উৎসবে মনের কথাগুলো তাঁকে লিখতে পারলাম।”
উৎসবে অংশ নেওয়া অনেকের কাছে চিঠি লেখা হয়ে ওঠে প্রয়াত প্রিয়জনের স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। এমন একটি আয়োজনের সুযোগ করে দেওয়ায় আয়োজকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তাঁরা।
চিঠি লেখার পাশাপাশি উৎসবে ছিল ডাকটিকিটের বিশেষ প্রদর্শনী ও বিভিন্ন স্টল। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, দশ ও বিশ টাকা মূল্যমানের বিরল ও স্মারক ডাকটিকিট প্রদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডাকটিকিটের ইতিহাস ও সংগ্রহ সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। এ ছাড়া ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ডাক, রেজিস্ট্রি, স্পিড পোস্ট, পার্সেল, সঞ্চয়পত্র এবং ডিজিটাল লেনদেন সেবা ‘নগদ’ সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়। ফলে ডাক বিভাগের ঐতিহ্যবাহী সেবার পাশাপাশি আধুনিক সেবাগুলো সম্পর্কেও ধারণা পান দর্শনার্থীরা।
আয়োজনটিতে সহযোগিতা করেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), ফ্রেশ স্টেশনারি ও ফ্রেশ কফি। ফ্রেশ স্টেশনারির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের চিঠি লেখার উপকরণ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ফ্রেশ কফির সৌজন্যে উৎসবে আসা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কফি পরিবেশনের ব্যবস্থা ছিল।
