আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহন করিডর গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এই উদ্যোগকে নতুন গতি দিয়েছে। এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব নয়, এশিয়ার জ্বালানি বাজার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এইচএসবিসি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী জর্জেস এলহেদারি গত মঙ্গলবার দুবাইয়ে এক অনুষ্ঠানে পূর্বাভাস দিয়েছেন, বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক কমে যেতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে পূর্বাভাস, নিশ্চিত পরিণতি নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাতীয় তরল পদার্থ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই পথ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, বিকল্প পথ তৈরি হলেও হরমুজের গুরুত্ব রাতারাতি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও সার উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।
হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত তেলের বড় অংশ এশিয়ার বাজারে যায়। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এ প্রবাহের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার হিসাবও বদলে দিতে পারে। বিকল্প পথের মাধ্যমে সরবরাহ অব্যাহত রাখা সহজ হলে আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তা ইতিবাচক হতে পারে। তবে নতুন পাইপলাইন তৈরি হলেই তেলের দাম কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন, আন্তর্জাতিক চাহিদা, যুদ্ধের ঝুঁকি, জাহাজের বিমা, পরিবহন ব্যয় ও প্রধান রপ্তানিকারকদের সিদ্ধান্তও দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এ পরিস্থিতিতে বড় অর্থনীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, কৌশলগত মজুত এবং সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকে আরও মনোযোগ দিতে পারে। বাংলাদেশও এই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল, এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে আমদানি বিলও বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে বাংলাদেশের লাভ নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি এবং আমদানির প্রকৃত উৎসের ওপর। শুধু হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহন সম্ভব হওয়াই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কমার নিশ্চয়তা নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আমদানিকৃত জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে বা স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। গ্যাসের ঘাটতি শিল্পকারখানার উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার এক জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে বা কমেছে বলে জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হলে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষায় সুবিধা হতে পারে। বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে কৃষিপণ্য বাজারে আনার খরচ থেকে শুরু করে গণপরিবহন ও শিল্পপণ্যের দাম পর্যন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এই প্রভাব সব সময় একই গতিতে বা একই মাত্রায় দেখা দেয় না। সরকার জ্বালানির দাম সমন্বয়, ভর্তুকি, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং আমদানির সময় নির্ধারণের মাধ্যমে কিছু চাপ সামাল দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হলে সরকারি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও প্রবাসী আয়ের উৎস। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি দীর্ঘদিন জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা পরিবহন, শিল্প, পর্যটন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বিকল্প বাণিজ্য করিডর গড়ে ওঠার ফলে এসব খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়তে পারে।
