চাঁদপুরের মতলব উত্তরে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মেঘনা নদীতে অবাধে ইলিশ শিকার ও ডিমওয়ালা মাছ বিক্রি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে; দুর্গম চরাঞ্চল, জনবলসংকট ও সীমিত বরাদ্দের কারণে অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না প্রশাসন।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মেঘনা নদীতে অবাধে ইলিশ শিকার চলছে। দুর্গম চরাঞ্চল ও বিভিন্ন ঘাটে অস্থায়ী হাট বসিয়ে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে তাজা ইলিশ, যার বড় একটি অংশ ডিমওয়ালা ইলিশ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই অবাধে চলছে ইলিশ শিকার ও বিক্রি। মাছের চাহিদা, ভালো দাম ও অধিক লাভের আশায় একশ্রেণির অসাধু জেলে ও মৌসুমি ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন। নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ট্রলারে করে মাছ এনে সরাসরি ঘাটে বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বসছে খুচরা বাজার। মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী হাট।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার চরউমেদ আমিরাবাদ, এখলাসপুর, বাহেরচর, মোহনপুর, বোরোচর, কাচিয়ারা বাজার, জনতা বাজার ও ষাটনল এলাকার বিভিন্ন স্থানে এমন চিত্র দেখা গেছে। একের পর এক মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে ভিড়ছে, আর জেলেরা ঝুড়ি ও ডালিভর্তি মাছ নিয়ে পাড়ে উঠছেন। কেউ কেউ ঘাটে পৌঁছানোর আগেই ট্রলারে থাকা অবস্থায় পাইকারদের কাছে মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। পরে সেই মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে বসছেন খুচরা বিক্রেতারা। ক্রেতারা দরদাম করে পছন্দের ইলিশ কিনছেন।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, এসব এলাকার পাঁচ থেকে সাতটি পয়েন্টে প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যার পর রাতেও মাছ কেনাবেচা চলে। উপজেলার বোরোচরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টেও অবাধে মাছ বিক্রি হচ্ছে। শিবচরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা আসায় বাজারগুলো জমজমাট হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, এবারের বাজারে ইলিশের ভালো দাম এবং ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা পড়ায় জীবিকার তাগিদে তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরছেন। সরকারিভাবে দেওয়া চালের সহায়তায় সংসার চলে না বলে দাবি তাঁদের। প্রকৃত জেলেদের অনেকে সেই সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া এবং প্রজননের মাধ্যমে এ মাছের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রকাশ্যে মাছ ধরা ও বিক্রির ঘটনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযানে সীমাবদ্ধতা, জনবলসংকটের কথা জানাল প্রশাসন
মা ইলিশ রক্ষায় মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দুর্গম চরাঞ্চল, জনবলসংকট, সীমিত বরাদ্দ এবং অভিযানের খবর আগেভাগে চরাঞ্চলে পৌঁছে যাওয়ায় অবৈধ ইলিশ শিকার ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে জানান, সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চাঁদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী হাট বসার কথা স্বীকার করে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, জনবলসংকটের কারণে সব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া এ বছর নদীতে জেলেরা অত্যন্ত মারমুখী আচরণ করছেন। অল্পবয়সী অনেককে নিয়ে মাছ ধরতে নদীতে নামছেন তাঁরা। বয়সের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
