ইন্দোনেশিয়ায় খরার কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ দাবানল বন ও শুষ্ক ভূখণ্ড পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু অংশে মারাত্মক ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। সেই দাবানল নেভাতে গিয়ে আরও এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী প্রাণ হারানোর পর, আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ইন্দোনেশিয়ার স্কুলশিক্ষার্থীরা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছে।
বননিধন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নুসানতারা অ্যাটলাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত নয় মাসে দাবানলে ১৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়ে গেছে—যদিও সরকার এই পরিসংখ্যানের কথা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি। এর ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়াশায় ইন্দোনেশিয়ার লাখ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং এই ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও পূর্ব তিমুর পর্যন্ত।
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভা দ্বীপের গভর্নর জনগণকে একত্রিত হয়ে ‘বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে মাউন্ট ব্রোমো এবং বালুরান জাতীয় উদ্যানসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রদেশটির ইসলামী মাদ্রাসা ও স্কুলগুলো বৃহস্পতিবার আল্লাহর দরবারে রহমতের প্রার্থনায় অংশ নেয়।
পূর্ব জাভার রাজধানী সুরাবায়ার একটি স্কুলে আয়োজিত প্রার্থনার বিষয়ে শিক্ষক মোহাম্মদ জাতিম বলেন, ‘অনেক এলাকা দাবানলসহ নানা ধরনের খরার সম্মুখীন হচ্ছে... ধর্ম এই খরা সমস্যা সমাধানের পথ দেখায়। বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আমরা অবশ্যই আশাবাদী।’
একই প্রদেশের মালাং এলাকার একটি বৃত্তিমূলক হাইস্কুলে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের সাথে সেজদায় অবনত হয়ে প্রার্থনা করে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা লুসিয়া আন্দ্রিয়ানি বলেন, ‘আমরা আশা করি যে এর মাধ্যমে... শিগগিরই বৃষ্টি নামবে। দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ার কারণে ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’
অগ্নিনির্বাপক কর্মীর মৃত্যু
ইন্দোনেশিয়ায় প্রতি শুষ্ক মৌসুমেই দাবানলের ঘটনা ঘটে, তবে এ বছরের অগ্নিকাণ্ড ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ—যা শত শত মানুষকে অসুস্থ করে তুলেছে।
এই ধোঁয়াশার কারণে মালয়েশিয়া ও পূর্ব তিমুরে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে এবং এটি সিঙ্গাপুর এমনকি ফিলিপাইন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
গত সপ্তাহে পূর্ব জাভার ব্রোমো টেঙ্গার সেমেরু জাতীয় উদ্যানে ধোঁয়া ও আগুনের শিখায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পাঁচজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী মারা যান।
সবশেষ বুধবার ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের দক্ষিণ কালিমান্তানে আরও একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী মারা গেছেন।
দুর্যোগ ত্রাণ বিষয়ক এনজিও 'মহাথির মোহাম্মদ জয়ন ফাউন্ডেশন' জানিয়েছে, ৫১ বছর বয়সী ওই স্বেচ্ছাসেবী বারিতো কুয়ালা অঞ্চলে আগুন নেভাতে সাহায্য করার সময় বুকে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
ফাউন্ডেশনটি জানায়, তাঁর এই মৃত্যু বন ও মাঠের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের জীবনের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের ধীরগতির প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং পশ্চিম কালিমান্তানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
রাজধানী জাকার্তায় বৃহস্পতিবার বেশকিছু বিক্ষোভকারী চীনের দূতাবাসের সামনে জড়ো হয়ে ইন্দোনেশিয়ার পাম তেল, খনি ও বনজ পণ্যের আমদানিকারকদের ইন্দোনেশিয়ার জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশের দাবি জানায়।
এদিকে মালাং এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ সাইফুদ্দিনও অলৌকিকতার আশায় প্রার্থনায় যোগ দেন। তিনি বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে আমি ভাবছিলাম কেন প্রায় সবাই যুক্তি ব্যবহার করে এই দুর্যোগ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। আমরা কেন এর বদলে ‘আকাশ থেকে সমাধানের’ পথ খোঁজার চেষ্টা করছি না?”
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: ইন্দোনেশিয়া
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
