Published on
:
3 min read
হরি রায়
রান্নাঘরের মেঝে মুছতে মুছতে... ঠিক তা-ই। দাপুটে বাতাসের প্রচণ্ড শব্দ। আইসল্যান্ডের বেকিয়াভিক অঞ্চলটাকে তো বলাই হয়, উতল হাওয়ার দেশ। সেখানেই তাঁর বাড়িতে রান্নাবান্নার পরে রান্নাঘরের মেঝে মুছছিলেন ৭৫ বছর বয়সের অ্যান কারসন। এমন সময়ে বেজে উঠল ফোন। এবং এল এই সংবাদ— অ্যান কারসন, সুইডেনের নোবেল অ্যাকাডেমি ২০২৬-এ নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে আপনাকে সম্মানিত করছে আপনার সাহিত্যকর্মে নতুন আধুনিকতার জন্য, যে অনন্য আধুনিকতায় আপনি মিশিয়েছেন পৌরাণিক দর্শন ও চরিত্রের সমসাময়িক বীক্ষণ ও ব্যাখ্যা।
অ্যান কারসন বরাবর এক নেপথ্যচারিণী লেখিকা, যাঁর একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদে তাঁর ছবিরও দেখা পাইনি আমি। ১৯৫০-এ টরন্টোয় জন্মানো কারসন অবশ্যই ক্যানাডিয়ান। কিন্তু ২০০৮ থেকে স্বামীর সঙ্গে তিনি থাকেন আইসল্যান্ডে। এবং ২০২২ সাল থেকে তিনি আইসল্যান্ডের নাগরিক। তাই তিনি আইসল্যান্ডের লেখিকা, এ কথা বললে খুব ভুল বলা হবে না। তাঁর লেখার মূল উৎস তো গ্রিস এবং রোমের প্রাচীন সাহিত্য ও দর্শন। সুতরাং তিনি ইউরোপের তো বটেই। এ ছাড়া, সাহিত্য সৃজনের পাশাপাশি তিনি অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ কাল। এবং গবেষণা ও অধ্যাপনায় তাঁর মূল বিচরণক্ষেত্রও প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভাষা ও সাহিত্য। কিন্তু তিনি নন মার্কামারা পুরাবিদ। বরং তিনি ঠিক তার উল্টো। তিনি অতি-সাহসী ছকভাঙা এক উত্তর-আধুনিক লেখক, যিনি হেলেন অফ ট্রয়ের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন হলিউডের মেরিলিন মনরোর! আমরা সকলেই জানি, মেরিলিন মনরোর আসল নাম ছিল নর্মা জিন বেকার। কাব্যেগানে উথলে পড়া এক দুঃসাহসী নাটক লিখলেন অ্যান কারসন এই নামে— ‘নর্মা জিন বেকার অফ ট্রয়’। আর সেই নাটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, প্রাচীন হেলেন মিথ ও মিথ্যা নয়। প্রাচীন মহাকাব্যের হেলেন আর এই যুগের মেরিলিন একই নারী, যাঁর সৌন্দর্য এবং আকর্ষণের মূল উৎস যৌন ডাক। এবং দু’জনকেই দিতে হয়েছে, পুরুষ শাসিত সমাজে, তাদের যৌন দাপট ও আকর্ষণের ট্র্যাজিক মূল্য। ২০১৯-এ নিউ ইয়র্কে মঞ্চস্থ হয় ‘নর্মা জিন বেকার অফ ট্রয়’। এবং মঞ্চে ক্রমে মুছে যেতে থাকে হেলেন অফ ট্রয় এবং মেরিলিন অফ হলিউডের বিভেদরেখা। মিশে যায়, গানে-কবিতায়, দুই পরমার শরীর, আর্তি, অসহায়তা, কান্না। তাদের সৌন্দর্য যত দেয় তাদের, তার চেয়ে অনেক বেশি কেড়ে নেয়।
শহরের একটু বাইরে, এক স্যাঁতসেতে অন্ধকারে বাস করি আমি। তেমন মিশুক নই। তাই বন্ধুবান্ধব নেই বললেই চলে। নারী পছন্দ করি না, তেমন মিথ্যে বলি কেমন করে? কিন্তু ঠিক যেমন নারী চাই, তাকে পাই কোথায়? যেমন ধরুন স্যাফো আমার খুব পছন্দের মেয়েমানুষ। কোন স্যাফো? আরে, স্যাফোর মতো দুঃসাহসী মেয়েমানুষ তো সারা পৃথিবীতে একটাই, স্যাফো অফ লেসবোজ়! এক মেয়ের সঙ্গে আর এক মেয়ের প্রেম ও যৌনতার রহস্যময় সম্পর্ক। স্যাফোর যত কবিতা, সেই কবে ভেবে দেখুন, সেভেন্থ সেঞ্চুরি, শুধু এই বিষয় নিয়ে সেই মেয়ে লিখে গেছেন। লেসবিয়ান প্রেম। লেসবিয়ান সম্পর্ক। লেসবসের স্যাফো ছাড়া আর কে অমন লেখা লিখবে বলুন লেসবিয়ান প্রেম নিয়ে? ওই নামের মধ্যে তো নিজের জন্মভূমিকে অমর করে দিয়ে গেছে মেয়েটা!
এ বার নিশ্চয় আপনাদের মধ্যে প্রশ্ন, হঠাৎ স্যাফোকে টেনে আনলাম কেন? তার কারণ, অ্যান কারসনের ‘এসে’ নামের একটা আস্ত বই তো স্যাফোকে নিয়ে। তবে বইটার পুরো নাম ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’। কিন্তু একটা রচনা নয়। অনেকগুলো রচনা নিয়ে একটা রচনা। যেমন, ‘বিটারসুইট’, ‘গন’, ‘রুজ়’, ‘দ্য রিচ’, ‘লজিক অ্যাট দ্য এজ’, ‘লুজ়িং দ্য এজ’, ‘মাই পেজ মেকস লাভ’, ‘ফোল্ডেড মিনিংস’, ‘রিয়্যালিস্ট’... এমনি চলছে তো চলছে, গোটা ৩৫ আলাদা আলাদা রচনাকে এক অদৃশ্য বুননে এক করে দিয়ে একটি রচনা বা ‘এসে’, যাকে ধারণ করে আছে এক সমকামিনী, স্যাফো! এই মেয়ে, তার সমস্ত প্রেমের কবিতা, প্রেমের দর্শন, উচ্চারণ ও ইশারা নিয়ে, কারসনের বীক্ষণে ও ব্যাখ্যায় আমাকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
মনে হচ্ছে আমার এই স্যাঁতসেতে ঘরে কেমন যেন একটা রোদালো ভাব! এখনও পৃথিবীতে এত এত নতুন ভাবনা আছে!
