
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের বাজারে পেপে ও আলু ছাড়া ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। সবজি ছাড়াও মাছ, মুরগি ও ডিম কিনতে গিয়ে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে স্বস্তি নেই ক্রেতাদের।
বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোকে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় কেউ কম পরিমাণে কিনছেন, কেউবা খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসের মতো পণ্য। এ অবস্থায় বাজার তদারকি জোরদার ও পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার নগরের লালবাজার, কাজিরবাজার ও রিকাবীবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, পেপে ও আলু ঠাড়া ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। বেশির ভাগ সবজিই বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক চড়া দামে। প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটল, ঢ্যাঁড়শ ও চিচিঙ্গার দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং বাঁধাকপি ৮০ টাকা ও ফুলকপি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগাম শীতকালীন সবজি নতুন শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। তবে আলু ৩০ টাকা ও পেঁপে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
সবজির পাশাপাশি মাছ-মাংসের দামও ক্রেতাদের চাপে ফেলছে। আকার ভেদে বাজারে প্রতি কেজি রুই মাছ ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, কাতলা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষের পাঙাশ ১৮০ থেকে ২২০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। দেশি শিং, মাগুর ও চিংড়ির মতো মাছের দাম আরও বেশি। মাছের দাম বেশি থাকায় অনেক ক্রেতাকে পছন্দের মাছের বদলে তুলনামূলক কম দামের মাছ কিনতে হচ্ছে।
মুরগি ও ডিমের বাজারেও খরচ কমানোর সুযোগ সীমিত। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩২০ টাকা এবং লাল লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের লাল ডিমের ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। গরুর মাংস কেজিতে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজার করতে আসা ক্রেতাদের মন্তব্য, আয়-রোজগার না বাড়লেও নিত্যদিনের ব্যয় বাড়ছে। ফলে একই পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে গেলেও আগের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যাচ্ছে না। মাছ কিনলে সবজির পরিমাণ কমাতে হচ্ছে, আবার মাংস কিনতে গেলে অন্য খরচে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বাসিন্দা নিলেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, “শীতকালীন সবজির মৌসুম চলছে, এই সময় তো সবজির দাম কম থাকার কথা। অথচ পেঁপে আর আলু ছাড়া ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। বেগুন, টমেটো, শিম কিনতে গেলে দাম শুনেই মাথা ঘুরে যায়। আমাদের আয় তো বাড়েনি, কিন্তু বাজার খরচ প্রতিদিন বাড়ছে। তাহলে সাধারণ মানুষ চলবে কীভাবে? বাজারে সিন্ডিকেট থাকলে ভাঙতে হবে, আর যারা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
জল্লারপাড়ের বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ‘বাজারে গেলে মনে হয়, ব্যবসায়ীদের দয়ার ওপর বেঁচে আছি। এক সবজি কিনতেই পকেট খালি, মাছ-মাংসের কথা তো বাদই দিলাম। আগে যে টাকা দিয়ে এক সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন সেই টাকা দু-তিন দিনেই শেষ হয়ে যায়। বেতন বাড়ে না, আয় বাড়ে না, অথচ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। প্রশাসন শুধু আশ্বাস না দিয়ে বাজারে কার্যকর নজরদারি করলে খেটে খাওয়া মানুষ প্রাণে বাঁচে।’
অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও দোকান পরিচালনার খরচ যুক্ত হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। সরবরাহ, পণ্যের মান ও বাজারভেদেও দামের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম কমলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু খুচরা পর্যায়ে নজরদারি বাড়ালেই বাজার পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। উৎপাদন এলাকা থেকে পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন, পাইকারি বিক্রি ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ক্রেতারা বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, দোকানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়মিত যাচাই করা গেলে ভোগান্তি কিছুটা কমতে পারে।
