জালালাবাদ রিপোর্ট: দেশে উৎপাদনের চেয়ে খাদ্যে চাহিদা বেশি হওয়ায় বাড়ছে আমদানি নির্ভরতা। এরবাইরে উৎপাদন খরচের চেয়ে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় শষ্য না পাওয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। পাশাপাশি মজুদের তুলনায় বিতরণ বেশি হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয় আমদানি থেকে।
এদিকে দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদে রেকর্ড হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট শেষে চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি খাদ্য মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৪১ হাজার টন, যা অতীতের য়ে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও আমদানির ওপর নির্ভর করে খাদ্য মজুদে এই রেকর্ড হয়। তবে চলতি মাসের প্রথমার্ধে খাদ্য মজুদ কমে সাড়ে ২২ লাখ টনে নেমেছে। মূলত সরকারি বিতরণে গতি বাড়ায় সম্প্রতি মজুদ কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। আর গত অর্থবছরে আমদানি বেড়েছিল সাড়ে ৯ লাখ টন। একই সময়ে খাদ্যশস্যের সরকারি বিতরণ বেড়েছে ৬৯ হাজার টন। আর গত অর্থবছরে বিতরণ বেড়েছিল আড়াই লাখ টনের মতো। তবে আমদানি ও বিতরণ বাড়লেও সরকারি পর্যায়ে বোরো চাল সংগ্রহ কমেছে।
এমন বাস্তবতায় দেশের খাদ্য মজুদ শক্তিশালী করতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সংগ্রহ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহে ঘাটতি থাকলে চাহিদা মেটাতে আগামীতেও আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়লেও আমদানিনির্ভরতা কমাতে না পারা এবং অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কমে যাওয়া দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত উৎপাদনের ব্যবধান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সেচে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে খাদ্য আমদানির প্রয়োজন বাড়ছে।
অন্যদিকে, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের ধান ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে আগ্রহ কমছে। তাদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সরকারি মজুদ বাড়ানো বা আমদানি করে চাহিদা মেটানোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না; বরং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া, কৃষিজমি রক্ষা, সরকারি সংগ্রহব্যবস্থা কার্যকর করা এবং খাদ্যপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও সাশ্রয়ী দামে খাদ্য কিনতে পারে।
বেড়েছে আমদানিনির্ভরতা : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ কোটি ৫১ লাখ ৫২ হাজার টন। এর বিপরীতে প্রকৃত মোট উৎপাদন প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হয়েছে ১৬ লাখ ৫৬ হাজার টন। ওই অর্থবছরে নিট অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৯১ লাখ ৪৬ হাজার টন। বীজ, পশুখাদ্য ও অপচয়সহ বিভিন্ন খাতে ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে নিট উৎপাদনের হিসাব করা হয়। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে চাল ও গম আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার টন। সে হিসাবে, এবার প্রথম দুই মাসে খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টন বা ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। আমদানি বেড়েছিল গত অর্থবছরেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে দেশে মোট খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে ৮৬ লাখ ২৩ হাজার টন। এর মধ্যে সরকারি খাতে আমদানি ছিল ১৩ লাখ ৬ হাজার টন এবং বেসরকারি খাতে ৭৩ লাখ ১৭ হাজার টন। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ মোট আমদানি ছিল ৭৬ লাখ ৭২ হাজার টন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছিল ৯ লাখ ৫১ হাজার টন।
সংগ্রহের তুলনায় বিতরণ বেশি : দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম একই সঙ্গে চলে। উৎপাদন মৌসুমে একদিকে সরকার কৃষকদের থেকে ধান-চাল কেনার মাধ্যমে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাবছর বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও বিপণন কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ করে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ ছিল ২৬ লাখ ৭১ হাজার টন। একই সময়ে সরকারি বিতরণ ছিল ৩৫ লাখ ৮ হাজার টন। অর্থাৎ, ওই অর্থবছরে সরকারি বিতরণ অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের চেয়ে ৮ লাখ ৩৭ হাজার টন বেশি ছিল। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি বিতরণ ছিল ৩২ লাখ ৫৫ হাজার টন। এ হিসাবে গত অর্থবছরে বিতরণ বেড়েছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার টন। এদিকে চলতি অর্থবছরেও সরকারি খাদ্যশস্য বিতরণ বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে চাল ও গম মিলিয়ে সরকার বিতরণ করেছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন। অর্থাৎ সরকারি বিতরণ বেড়েছে ৬৯ হাজার টন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে আমদানি ও বিতরণ বাড়লেও সরকারের বোরো চাল সংগ্রহ কমেছে। জুলাই-আগস্টে বোরো চাল সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ১৯ হাজার টন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বোরো চাল সংগ্রহ কমেছে ১ লাখ ৯২ হাজার টন।
