ময়মনসিংহের ত্রিশালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি বড় উদ্যোগ। তবে এর গুরুত্ব কেবল একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, সেটিই মূল প্রশ্ন।
বাস্তবতা হলো, দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। অর্থনীতির প্রসার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আকাশপথে যাত্রী চলাচলের ঊর্ধ্বগতির ফলে আগামী বছরগুলোতে এই চাপ আরও বাড়বে। সেই বাস্তবতায় নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে ভাবনা অযৌক্তিক নয়। বরং এটি সময়ের দাবি বলেই মনে হয়।
তবে বিমানবন্দর নির্মাণ আর একটি সফল বিমানবন্দর গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। বিশ্বের সফল বিমানবন্দরগুলো আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি, দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন কিংবা কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয়; এগুলো নিজ নিজ দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শিল্প, লজিস্টিকস, পর্যটন ও বিনিয়োগের বিস্তৃত ক্ষেত্র।
ত্রিশালের ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন সেখানেই। এটি কি শুধু একটি রানওয়ে ও টার্মিনাল ভবনের প্রকল্প হবে, নাকি উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার কেন্দ্র হয়ে উঠবে? বিমানবন্দরকে ঘিরে যদি পরিকল্পিত শিল্পায়ন, কার্গো পরিবহন, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তাহলে এর প্রভাব বিমান চলাচলের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে পড়বে।
একইভাবে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্তকেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। বিমান খাত এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে আজকের সিদ্ধান্তের ফল পাওয়া যায় এক দশক পরে। বর্তমান বহরের বড় একটি অংশ আগামী বছরগুলোতে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হবে। ফলে এটি কেবল বহর সম্প্রসারণ নয়, ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিশ্চিত করারও প্রস্তুতি।
তবে আশার পাশাপাশি সতর্কতাও রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আর শুধু প্রকল্পের ঘোষণা শুনতে চায় না; দেখতে চায় তার সুফল। অতীতে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। ত্রিশাল বিমানবন্দরের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ত্রিশাল বাংলাদেশের চাঙ্গি বা ইনচন হবে কি না, তা আজ বলা সম্ভব নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতির নতুন প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে। আর যদি দূরদর্শিতার অভাব থাকে, তবে এটি আরেকটি ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। আমরা কি কেবল একটি বিমানবন্দর নির্মাণ করবো, নাকি তার মাধ্যমে একটি নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তুলবো? উত্তরটি নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্ত ও আগামী দিনের বাস্তবায়নের ওপর। ইতিহাস বলে, বড় প্রকল্প নয়, সঠিক প্রকল্পই একটি দেশের ভাগ্য বদলে দেয়। ত্রিশালের ক্ষেত্রে সেই সত্য আবারও প্রমাণ করার সময় এসেছে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]
