নাব্যতা-সংকটে হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির চিহ্ন মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শিল্পবর্জ্যের দূষণে পানি বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। এই নদীর বিষাক্ত পানি থেকে হারিয়ে গেছে মাছসহ জীববৈচিত্র্য। হুমকি দেখা দিয়েছে পরিবেশে।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, একসময়কার সমৃদ্ধ জলপথ হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন তীব্র পরিবেশগত সংকটের কবলে পড়েছে। কারখানার শিল্পবর্জ্য নদীটিকে বিষাক্ত জলাশয়ে পরিণত করেছে। নদীতে স্বচ্ছ পানির কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধু শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের কালো কুচকুচে পানি। খরস্রোতা এ নদীটি এখন মৃতপ্রায়। শিল্পকারখানার বর্জ্য এ নদীটিকে মারণব্যাধিতে আক্রান্ত করেছে। এতে অস্তিত্ব হারাচ্ছে সুতাং নদী। শিল্পবর্জ্যের দূষণে নদীটি এখন মানুষের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ কোম্পানিগুলোতে নিয়মিত ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ব্যবহার না করা। ফলে মারাত্মক দূষণে জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কয়েক হাজার জেলে।
অন্যদিকে চাষাবাদে বিষাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নষ্ট হচ্ছে জমির ফসল। এছাড়া নদীর পানি ব্যবহার করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো কোম্পানিগুলো পরিচালিত হচ্ছে। আর যাদের এসব দেখভাল করার কথা, সেই পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন যেন কিছুই দেখছেন না। মনে হয় কোম্পানিগুলোর এসব অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই।
জানা যায়, সুতাং নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে এটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুতাং বাজারের ওপর দিয়ে লাখাই উপজেলার মাদনা এলাকা হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনার শাখা কালনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৬ মিটার।
সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নজরদারির অভাবে বহমান এ নদীটি কালের আবর্তে বিলীন হতে চলেছে। শিল্পদূষণের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও অতি বর্ষণের ফলে ভারত থেকে আসা উজানের পানি ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে নদীটি।
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকার স্থানীয়রা জানান, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য সুতাং নদীতে ফেলা হচ্ছে। এখানে গড়ে ওঠা অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি)। যেসব কোম্পানিতে ইটিপি রয়েছে, সেগুলো অতিরিক্ত খরচের ভয়ে নিয়মিত চালানো হচ্ছে না। সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেখাতে অনেক কোম্পানি ইটিপি স্থাপন করেছে। কিন্তু এগুলো বন্ধ রেখে কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সুতাং নদীতে। অথচ শিল্পকারখানাতে ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা এসব দেখেও না দেখার ভান করে আছেন।
ফলে নদীর তীরবর্তী শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই, আলগাপুর, শৈলজুড়া, সদর উপজেলার সাধুরবাজার, ভঙ্গুরহাটি, রাজিউড়া, ফান্দ্রাইল, সানাবই, উচাইল, বেকিটেকা, নাজিরপুর, লুকড়া, লাখাই উপজেলার করাব, বুল্লা, বেগুনাই, বরগান্দিসহ বেশকটি গ্রামে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক বিপর্যয়ের পাশাপাশি উদ্বেগজনক মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সুতাং নদীর পানি দূষণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে প্রাণ (আরএফএল) ও স্কয়ার কোম্পানির একাধিক প্রতিষ্ঠানের। তারা অলিপুর এলাকায় বিশাল আয়তন নিয়ে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে ছোট-বড় পাইপ দিয়ে সরাসরি শৈলজুড়া খালে ফেলা হচ্ছে, আর খালের পানি যাচ্ছে সুতাং নদীতে।
কৃষকরা জানান, এ নদীর পানি ব্যবহার করে লাখাই ও সদর উপজেলার প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হতো। বর্তমানে শিল্পদূষণ ও পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে অনেক জমি, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের কৃষক ছালেক মিয়া বলেন, আমাদের অবস্থান ভাটি এলাকায় হওয়ায় বন্যার সময় সব জমিতে পানি উঠে যায়। আগে বন্যার পানি উঠলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এখন আর জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় না, উল্টো জমি নষ্ট হয়ে যায়। কারণ সুতাং নদীর পানি বিভিন্ন কোম্পানির ময়লা-আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেছে।
সদর উপজেলার রাজিউড়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা আগে সুতাং নদীর পানি ব্যবহার করে বোরো ধান চাষ করতাম। কিন্তু নদীর পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসাবে গভীর নলকূপে দিয়ে চাষ করতে হচ্ছে। এজন্য খরচ দ্বিগুণের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধান চাষ করে আর লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধান চাষ করা বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া নদীর পানি ব্যবহার করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করে কোনো সুফল পাননি।
সাধুর বাজারের ব্যবসায়ী মহসিন আহমেদ বলেন, সুতাং নদীর পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে, নদীর পানি ধানের জমিতে দিলে ধানের চারা মরে যায়। এখানকার গরু-ছাগল ও হাঁস নদীতে নামানো হলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সুতাং নদীর পানি ও মাছের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পদূষণের শিকার এই নদীর দূষণের মাত্রা নির্ধারণের জন্য গবেষকরা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে পানি, মাছ এবং পলির নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন বলেন, ‘পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পানি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া শিল্পদূষণের ফলে নদীর পানির ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে নদীর নিম্নপ্রবাহে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।’ নমুনা সংগ্রহের সময় গবেষকরা দেখতে পান, নদীর নিম্নপ্রবাহে মাছের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বিশেষ করে শৈলজোড়া খালের সংযোগস্থলের আশপাশের এলাকাটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যেখানে শিল্পবর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হয়। এই অঞ্চলে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী পাওয়া যায়নি।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. শাকির আহম্মেদ বলেন, আমরা এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছি, পানি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। বর্তমানে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য আরো পরীক্ষা চলছে।
খোয়াই রিভার ওয়াটার কিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, এই নদী বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সুতাং নদী একসময় কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে রয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, নইলে এই অঞ্চলের জনজীবন আরো সংকটের মুখে পড়বে।
পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. ইউসূফ আলী বলেন, সুতাং নদীর বিষয়টি যথাযথ মনিটরিং করা হচ্ছে। সিলেট অফিসের লোকজন স্যাম্পল কালেকশন করে তদন্ত করছে, নির্দেশনা এলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আছে, আমরা কড়া নজরদারিতে রেখেছি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছের নির্দেশে সম্প্রতি ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ একটি টিম সরেজমিনে তদন্ত করে গেছে। তারা খুব শিগগিরই রিপোর্ট পেশ করার পর আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
