খুলনায় বৈষম্যে আটকে গেছে দলিত সম্প্রদায়ের পেশা বদলানোর স্বপ্ন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
-->বাপ-ঠাকুরদারা জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন। সেই পেশা থেকে ছেলেকে বের করে আনতে পড়াশোনা করিয়েছিলেন চিরতন মুচি। কিন্তু কলেজ জীবন পার করেও দলিত সম্প্রদায়ের হওয়ায় ছেলে কোথাও কাজ পাননি বলে তার অভিযোগ। খুলনার ডুমুরিয়ায় চিরতনের মতো অনেকেরই পেশা বদলানোর স্বপ্ন আটকে যাচ্ছে সামাজিক বৈষম্যের কারণে।
খুলনার ডুমুরিয়ায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন দলিত সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ। সামাজিক মর্যাদা না থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়েছেন তারা। সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের। বংশপরম্পরায় মুচি, ঋষি, ডোম, মেথর বা হরিজন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চামড়ার কাজ ও দিনমজুরির মতো পেশায় যুক্ত এসব মানুষের অনেকেই জীবন চালান স্বল্প আয়ে।
ডুমুরিয়া বাজারের একটি গলিতে প্রায় ৩০ বছর ধরে জুতা মেরামতের কাজ করেন চিরতন মুচি। তার পূর্বপুরুষরাও একই কাজ করতেন। ছেলেকে এই পেশার বাইরে নিতে পড়াশোনা করালেও সেই চেষ্টা সফল হয়নি বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন
ডুমুরিয়ার ঋষপল্লিতে ৫৫ বছর ধরে বাঁশ-বেত দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করেন বলয় দাস। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যেন এই জাতে জন্ম নিয়ে বড় পাপ করেছি। কোথাও সম্মান নেই। সরকারি অনুদান, সুযোগ-সুবিধা কিছুই নেই। ব্যবসা করলেও ব্যাংক ঋণ মেলে না। বাজারে দোকানঘর মেলে না। ছোট জাত বলে কেউ কথাই শুনতে চায় না।’
জানা গেছে, খুলনা নগরীসহ বিভিন্ন পল্লিতে ১০ হাজারের বেশি দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। শুধু ডুমুরিয়ায় ৩৭টি ঋষিপল্লিতে বসবাস করেন কয়েক হাজার মানুষ।
ডুমুরিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সমাজের কিছু নিয়ম ও প্রথার কারণে এই জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়েছে। সামাজিক বৈষম্যের কারণে নির্দিষ্ট কিছু পেশার বাইরে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। সংবিধানে বৈষম্য নিষিদ্ধ থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।’
ঋষি সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণ সাগর দাস বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা ছোট ছিল। ভালো যোগাযোগ নেই, তাই চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও মূল্যায়ন করা হয় না।’
এদিকে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ৮০টি কমিউনিটি গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন সেমিনারে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা। স্থানীয় উদ্যোক্তা সমীর কুমার পান্ডে বলেন, ‘আমরা এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মানুষকে তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করছি।’
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ৩৪টি ট্রেডে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এই জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
আরও পড়ুন
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই অবাধে চলছে ইলিশ বেচাকেনা
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
প্রকাশ্যে মা ইলিশ মাছ বিক্রি করছেন এক মাছ ব্যবসায়ী। গত বৃহস্পতিবার চাঁদপুরের মতলব উপজেলা জনতা বাজারে। ছবি: খবরের কাগজ
-->সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চাঁদপুরের মতলবের উত্তরে মেঘনা নদীতে চলছে ইলিশ শিকার। দুর্গম চরাঞ্চল ও বিভিন্ন ঘাটে অস্থায়ী হাট বসিয়ে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হচ্ছে মাছ। এসব মাছের মধ্যে ডিমওয়ালা ইলিশও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছের চাহিদা, ভালো দাম পাওয়ার আশায় একশ্রেণির অসাধু জেলে ও মৌসুমি ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরছেন। নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ট্রলারে করে মাছ এনে সরাসরি ঘাটে বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জেলেরা মাছ বিক্রির জন্য বসাচ্ছেন খুচরা বাজার। মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী হাট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, বাজারে ইলিশের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা পড়ছে। জীবিকার তাগিদে তারা ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারিভাবে যে চাল সহায়তা দেওয়া হয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। প্রকৃত জেলেদের অনেকে এ সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হন।
আরও পড়ুন
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার চরউমেদ, আমিরাবাদ, এখলাসপুর, বাহেরচর, মোহনপুর, কাচিয়ারা বাজার, জনতা বাজার ও ষাটনল এলাকায় চলছে মা ইলিশের কেনাবেচা। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যার পর থেকে এসব এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মা ইলিশ।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুর্গম চরাঞ্চল, জনবল সংকট, সীমিত বরাদ্দ এবং অভিযানের খবর আগেই চরে পৌঁছে যাওয়ায় ইলিশ শিকার ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা প্রকৃত জেলে তারা সরকারি নির্ধারিত চাল পাচ্ছে না। তাই যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানো হচ্ছে।’
বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী হাট বসার কথা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ বছর জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় কম বয়সীদেরও সঙ্গে নিচ্ছেন। বয়সের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
আরও পড়ুন
শরীয়তপুরে এক শিক্ষকেই চলছে নার্সিং কলেজ
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
ছবি: খবরের কাগজ
-->শরীয়তপুরের ডামুড্যায় প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে নানা সংকট চলছে। ১৫৮ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একজন শিক্ষক। সাতটি ল্যাবের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র একটি। এ ছাড়া আইবাসব্যবস্থা চালু না হওয়ায় আটকে আছে সরকারি বরাদ্দ। বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের বৃত্তিও। এদিকে হোস্টেলে গ্যাস ও পানির সংকট রয়েছে। আবার পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নেই। এসব সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে মানসম্মত শিক্ষা এবং দক্ষ নার্স তৈরির কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা এলাকায় পাঁচ একর জমির ওপর প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজ। বর্তমানে কলেজটিতে চার ব্যাচে ১৫৮ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। এতে একাধিক ব্যাচের ক্লাস নেওয়া, সময়মতো পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অধ্যক্ষকেও পাঠদান করতে হচ্ছে।
তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা দাস বলেন, ‘আমাদের ২২টি বিষয়, অথচ শিক্ষক মাত্র একজন। অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। সব বিষয় ইংরেজিতে পড়ানো হয়। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে কতটুকু শিখতে পারব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। এভাবে নিজেরা নিজেরা পড়াশোনা করে কত দূর এগোতে পারব, সেটাও বুঝতে পারছি না।’
আরও পড়ুন
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা। মাহিমা আক্তার নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় ল্যাবগুলো সচল না থাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ কমে গেছে। ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারব কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। আমরা চাই, শিক্ষকসংকট দূর করা হোক, সব ল্যাব সচল করা হোক এবং পর্যাপ্ত ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করা হোক।’
শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ‘আমাদের ল্যাবে প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জাম নেই। অন্য নার্সিং কলেজের তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। এখানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এভাবে পড়াশোনা শেষ করে পুরোপুরি দক্ষ নার্স হতে পারব কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
নিরাপত্তাপ্রহরী নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আদিবা আক্তার নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের কলেজ ও হোস্টেলে কোনো নিরাপত্তাপ্রহরী নেই। যেকোনো সময় বহিরাগত লোকজন প্রবেশ করতে পারে। আমরা অনিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করছি। এতে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। দ্রুত কলেজে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক।’
কলেজের একমাত্র শিক্ষক অসীমা রানী সরকার বলেন, ‘২২টি বিষয়ের জন্য আমি একাই শিক্ষক। অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। সাতটি ল্যাবের জন্য আলাদা শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু এখানে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কোনোটিই নেই। এতগুলো ক্লাস নিতে গিয়ে শুধু নামেই ক্লাস হচ্ছে। এখান থেকে পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা দক্ষ নার্স হতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কলেজ চালুর পরও জনবলের পদ সৃজন ও আইবাস কোড চালু হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নেই। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে অনেক কষ্টে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে হচ্ছে। আমরা বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ভর্তি ৮৮ জন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত এক কিশোর। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছবি: মোহাম্মদ হানিফ
-->নানা উদ্যোগ ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর চাপ। চলতি মাসের প্রথম ১৬ দিনে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন গড়ে ৮৮ জন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় নগর, জেলার ১৫টি উপজেলা এবং অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে এসে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গত জুন থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে হাসপাতালে রোগী ভর্তির চিত্র যাচাই করা হয়েছে।
দেখা যায়, চট্টগ্রামে জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। সে মাসে প্রতিদিন গড়ে ভর্তির সংখ্যা ৪ জন। পরে জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। এ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। আগস্টে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। মাসটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১ হাজার ২০২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, প্রতিদিন গড়ে ৩৮ জন। তবে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও দ্রুত বাড়ে। এ মাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৪৩০ জন, যা আগস্টের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ৮১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আর অক্টোবরের প্রথম ১৬ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪১৭ জন। এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হয়েছেন ৮৮ জন, যা আগের মাসের দৈনিক গড়ের চেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন
এদিকে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন। এর আগের বছর, ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৩২৩ জন। চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে নগরীর ২ হাজার ৭৮৭ জন, ১৫টি উপজেলার ২ হাজার ৪৭৩ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে এসে চিকিৎসা নেওয়া ৬২৩ জন রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৭৯০ জন, নারী ১ হাজার ৭২১ জন এবং শিশু ১ হাজার ৩৭২ জন।
এ ছাড়াও বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে নগরীর ১১ জন, বিভিন্ন উপজেলার ১৩ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে আসা ৪ জন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশনের অভিযানই যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মিত বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির ট্যাংক, ড্রাম ও অব্যবহৃত পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।’
জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু মশাবাহিত রোগ। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। আর জ্বর হলে গাফিলতি করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’
আরও পড়ুন
বরিশালে শয্যাসংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১২ এএম
রোগীর চাপে শয্যাসংকটে মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। সম্প্রতি বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে। ছবি: খবরের কাগজ
-->ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গ নিয়ে বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৭৭৩ জন। আর ১০ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২২ হাজার ৭২৪ জন। এর সঙ্গে গরমে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ।
তবে হাসপাতালগুলোতে রোগীর তুলনায় শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু বিভাগের ৭৫টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছে প্রায় ৪৫০ শিশু। একই রকম চিত্র দেখা যায় বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। সেখানেও ১৪টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ৪০ জনের রোগী। যা শয্যার চেয়ে প্রায় তিনগুণ।
আরও পড়ুন
বরিশাল সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৬৭১ জন চিকিৎসা নেন। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮৪ জনে। অর্থাৎ এক মাসে রোগী বেড়েছে ২১৩ জন বা প্রায় ৩২ শতাংশ। রোগীর চাপ সামাল দিতে ১০ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আরও চারটি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তবু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন রোগী এ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসছেন।
বরিশাল সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শয্যা না পেয়ে কেউ মেঝেতে, কেউ বেঞ্চে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বারান্দায়ও স্যালাইন হাতে অপেক্ষা করছেন অনেকে।
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ টুম্পা রানী বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ওয়ার্ডে ৪৫ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। প্রতিদিন ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শয্যাসংকট ছাড়া অন্য সবকিছু পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে রোগীর চাপের কারণে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ‘গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর চাপও বাড়ছে। রোগীদের চিকিৎসার জন্য খাবার স্যালাইন ও ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে শয্যাসংকট আছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শহরের মধ্যে হওয়ায় ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীরাও সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
এদিকে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানকার নবজাতক ও শিশু বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ জানান, এক দিনের হিসাব অনুযায়ী, শিশু বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১১ জন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১৫৫ জন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৩০ শিশু ভর্তি ছিল। বাকি শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
তিনি আরও বলেন, ‘শিশু বিভাগে নির্ধারিত শয্যা ৭৫টি হলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫০ শিশু ভর্তি থাকছে। ফলে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাম ও ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের সুবিধা পর্যাপ্ত নেই। এ কারণে গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন, ‘সীমিত জনবল নিয়ে রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তার ঘাটতি রয়েছে।’
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্তদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালগুলোর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হামের ঝুঁকি কমাতে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও চালু রয়েছে।’
