জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা-মেট্রো-গ-১৯-২৭৭৭) লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর মগবাজার বিশাল সেন্টারের সামনে পার্ক করা গাড়ির চালকের আসনের পেছনের সিট বরাবর কাঁচে গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে কে বা কারা ঠিক কি কারণে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা উদ্ঘাটন, এমনকি কাউকে শনাক্তও করতে পারেনি পুলিশ।
সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, মগবাজারের বিশাল সেন্টারের তৃতীয় তলায় আসিফ আকবরের আইপি স্টুডিও রয়েছে। মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় দিনই আসিফ আকবর ওই স্টুডিওতে যান। শুক্রবার রাত ৮টার দিকেও তিনি ওই স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। সেখানে তার আরও কয়েকজন বন্ধুও ছিলেন। রাত ৩টার দিকে তার বন্ধুরা সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তখন স্টুডিওতে আসিফ, তার ছেলেসহ হাতে গোনা কয়েকজন ছিলেন। তার গাড়ির চালক নিচে ছিলেন। শনিবার ভোরে গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে বিশাল সেন্টারের নিরাপত্তাকর্মীরা ছুটে এসে দেখেন, পার্ক করা আসিফ আকবরের গাড়ির চালকের আসনের ঠিক পেছনের কাঁচে গুলি করা হয়েছে। পরে গাড়ি চালকও দৌড়ে আসেন। পরে তারা বিষয়টি আসিফ আকবরকে জানালে তিনিও নিচে নেমে গাড়িতে গুলি করা হয়েছে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেন।
ঘটনাস্থলে যাওয়া রাজধানীর হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি পিস্তলের গুলির খোসা। তবে কি মডেলের গুলি, সেটি ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি আসিফ আকবরের কাছেই আছে। তবে গাড়িটি পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে, পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, মূলত আসিফ আকবরের গাড়ির চালকের আসন বরাবর পিছনের আসন লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। এক রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। গুলিতে গাড়ির গ্লাস ভেঙে গেছে। খবর পেয়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আসিফ আকবরের সঙ্গে কথা বলেন। তবে তিনি কাউকে সন্দেহ করছেন না বা তার কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি। ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। একটি ফুটেজ পাওয়া গেছে, যেখানে হামলাকারীর শুধু পা দেখা গেছে। এই ফুটেজের সূত্র ধরে আমরা পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে কাজ করছি। ডিসি বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি- ঘটনার সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিশাল সেন্টারের সামনে এসে থামে। সেখান থেকে একজন নেমে এসে আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি করে আবার অটোরিকশায় উঠে মালিবাগের দিকে চলে যায়। তবে অটোরিকশায় আরও কেউ বসা ছিল কিনা সে বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, আসিফ আকবরের সঙ্গে তার অফিসের কারও বিরোধ আছে কিনা, তার কোনো বৈধ অস্ত্র আছে কিনা বা না থাকলে নতুন আবেদন করেছেন কিনা, তিনি তার এলাকা কুমিল্লায় স্থানীয় নির্বাচন করবেন কিনা বা তার সঙ্গে কারও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে কিনা- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে নিজ গাড়িতে গুলির ঘটনা নিয়ে আসিফ আকবর মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার সময়ে আমি মগবাজারের অফিসে বসে আমার বড় ছেলের সঙ্গে তখন কথা বলছিলাম। সে সময় সিসি ক্যামেরায় অস্বাভাবিক বিষয় মনে হলো। তার পরপরই নিচ থেকে সিকিউরিটি এসে বললো গুলি চলার কথা। এরপর পুলিশকে কল করলাম। ৪ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে পুলিশও চলে আসে। পরে আমি নিচে নামি। এরপর দেখলাম গাড়ির গ্লাসে গুলি লেগেছে। আসিফ আকবর বলেন, আমার বাসায়ও পুলিশের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি তো অনেক বিষয় নিয়েই কথা বলি, প্রতিবাদ করি। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে ভাবিনি। কারও প্রতি আমার সন্দেহ নেই। তবে পুলিশ খুব তৎপর। তারা তদন্ত করেই বের করবে মূল বিষয় কি। এটাই প্রত্যাশা।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনার) মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনা। আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনা শুনে আমি নিজে সেখানে গিয়েছি। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। তবে প্রতক্ষ্যদর্শী না থাকায় এই গুলির ঘটনায় সম্পূর্ণরূপে সিসি ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হবে। আমরা এতটুকু বলতে পারি, এই গুলির ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের সকলকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। তার বড় ভাই আনিস আকবর বলেন, একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমরা এমন ঘটনা আশা করতে পারি না। আমাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। আজকের ঘটনায় আল্লাহ হয়তো আসিফের হায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যথায় এখানে বড় কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারতো। তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
