হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আগামী শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। উৎসবকে ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদের সমন্বিত উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয়।
এদিকে সাইবার স্পেসে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। সাইবার স্পেস হলো ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ভার্চুয়াল জগৎ, যেখানে মানুষ তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার স্পেসে কঠোর নজরদারি জোরদার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে গুজব, অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা ঠেকাতে অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পোস্ট, গুজব বা অপপ্রচার ছড়িয়ে কেউ সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজা শেষ হবে। এবার প্রায় ৩৩ হাজার মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। উৎসব আনন্দময় ও নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মণ্ডপগুলোকে ঘিরে পুলিশ, প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে সাজানো হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, পূজার নিরাপত্তায় প্রথম স্তরে থাকবেন স্বেচ্ছাসেবকরা। তারা মণ্ডপে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং আগত ভক্তদের সহায়তা করবেন। দ্বিতীয় স্তরে থাকবেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। তারা মণ্ডপের মূল গেটে এবং আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। তৃতীয় স্তরে কাজ করবেন এসআরবি, এপিবিএন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সদা প্রস্তুত থাকবেন।
সূত্র আরও জানিয়েছে, দুর্গাপূজা চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর ও অন্যান্য ইউনিটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এবার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পূজা মণ্ডপকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ক্যামেরার মাধ্যমে মণ্ডপের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পুরো এলাকার ওপর নজর রাখা হবে।
সাইবার পুলিশ ইউনিট জানিয়েছে, উৎসবের সময় কিছু অসাধু চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই সাইবার পুলিশ ইউনিটের পাশপাশি গোয়েন্দারা অনলাইনে সক্রিয় রয়েছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা যুগান্তরকে বলেন, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রোববারও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সভা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। পূজা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছি, সরকারের পাশাপাশি বিএনপিও মনিটরিং সেল চালু করেছে। প্রতিটি মণ্ডপের কমিটিকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে রোববার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক সভায় আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।
সভায় অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন, এসআরইউ (স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট)’র অতিরিক্ত আইজি রেজাউল করিম, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি রেজাউল করিম, এসআরবির মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজি জি এম আজিজুর রহমান, অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সায়েদুর রহমান, রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ভারপ্রাপ্ত) ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান, হাইওয়ে রেঞ্জের অতিরিক্ত আইজি ফারুক আহমেদ, এসবিপ্রধান (অতিরিক্ত আইজি) কামরুল আহসান, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার এসপি ও নৌ পুলিশের এসপিরা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে রোববার বিকালে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা হয়েছে। এতে ঢাকা রেঞ্জের সব এসপি, সার্কেল, ওসি এবং পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা যুক্ত ছিলেন।