চাল ও ভোজ্যতেল, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার এই দুই অপরিহার্য পণ্যের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের প্রতিটি পরিবারের বাজেটে। অথচ বিশ্ববাজারে চাল ও ভোজ্যতেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার কোনো সুফল মিলছে না।
গত তিন বছরের (২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) চাল ও তেলের বাজারচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি পরিবারকে অন্তত ৪ হাজার টাকার বেশি বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে, জাতীয় অঙ্কে যা প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চালের বিভিন্ন শ্রেণিতে দামের ওঠানামা এবং ভোজ্য তেলের একাধিক দফা মূল্যসমন্বয় ভোক্তার ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
ঢাকা পোস্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তুলনামূলক চিত্রে মোটা চালের দাম বেড়েছে ২ টাকা ৭ পয়সা বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সরু চালের দাম বেড়েছে ৪ টাকা ৮৩ পয়সা বা ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত খুচরা মূল্য ২০২৪ সালের এপ্রিলে লিটারপ্রতি ১৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকায় ওঠে। এই দুই দরের ব্যবধান ৩৭ টাকা বা ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অক্টোবরের হিসাবে দাম বৃদ্ধির হার
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মোটা, মাঝারি ও সরু, তিন ধরনের চালের দামই বেড়েছিল। এর মধ্যে সরু চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল। মোটা চালের কেজিপ্রতি গড় দাম ৫১ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৫২ টাকা ২৮ পয়সা হয়। অর্থাৎ, এক বছরে দাম বেড়েছিল ৮৫ পয়সা বা ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মাঝারি চালের দাম ৬১ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৬২ টাকা ৪৩ পয়সায় দাঁড়ায়। এতে কেজিতে দাম বেড়েছিল ১ টাকা ১৮ পয়সা বা ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এছাড়া সরু চালের কেজিপ্রতি গড় দাম ৭২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৭৭ টাকা ১০ পয়সা হয়। অর্থাৎ, দাম বেড়েছিল ৪ টাকা ৪৩ পয়সা বা ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি দর এবং রাজধানীর কয়েকটি এলাকার খুচরা বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোটা চালের দাম ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি চাল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চালের দাম ৭৫ থেকে ৮০ টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটা চালের বর্তমান গড় দর ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় বেড়েছে ২ টাকা ৭ পয়সা বা ৪ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় বেড়েছে ১ টাকা ২২ পয়সা বা ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া সরু চালের বর্তমান গড় দর ৭৭ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় বেড়েছে ৪ টাকা ৮৩ পয়সা বা ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় বেড়েছে ৪০ পয়সা বা শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ। আর মাঝারি চালের বর্তমান গড় দর ৬২ টাকা ৫০ পয়সা বিবেচনায় নিলে তা ২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় প্রায় ১ টাকা ২৫ পয়সা বা ২ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের তুলনায় ৭ পয়সা বা শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ বেশি।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি ধানের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও চালের বাজারে পড়ছে।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের চাটখিল রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আব্দুস সত্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকভাড়া বেড়েছে। পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় চালের দামে এর প্রভাব পড়ছে। এতে কয়েক ধরনের চালের বস্তাপ্রতি দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। সব মিলিয়ে দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী।
আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশীয় দরের ব্যবধান
চালের বাজারে আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে দেশীয় দামের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের আন্তর্জাতিক দর টনপ্রতি ৫৮৯ ডলার ছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা কমে ৩৯২ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ, ওই দুই সময়ের মধ্যে টনপ্রতি দর কমেছে ১৯৭ ডলার বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে চালের দামে এই এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্বস্তিদায়ক পতনের পরও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খুচরা বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি; বরং দেশের বাজারে ওই সময়ে চালের দাম হয় অনড় ছিল, না হয় ক্যাটাগরিভেদে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাদ্য বিপণন বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে চালের দর ৩৩ শতাংশের বেশি কমলেও দেশের সাধারণ ভোক্তা এর সুফল পাননি। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক কারণ সক্রিয় ছিল।
প্রথমত, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের সময় যথাসময়ে সমন্বিত শুল্ক ছাড় না পাওয়া। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকটে জাহাজভাড়া, বীমা মাশুল এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের হ্যান্ডলিং খরচ চড়া থাকা। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ধান বা চাল আমদানির সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি হলেও দেশীয় অটোরাইস মিলমালিক ও পাইকারি সরবরাহ পর্যায়ে দাম না কমানোর প্রবণতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোজ্যতেলে দফায় দফায় মূল্যসমন্বয়
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত নির্ধারিত খুচরা মূল্য থেকে মূল্যবৃদ্ধির একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ছিল ১৬৭ টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা ১৭৫ টাকা, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ১৮৯ টাকা এবং অক্টোবরে ১৯৫ টাকা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাম ১৯৯ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বোতলজাত সয়াবিনের নির্ধারিত মূল্যের এই ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের এপ্রিলের ১৬৭ টাকা থেকে ওই বছরের ডিসেম্বরে দাম বেড়েছিল ৮ টাকা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আগের দরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ১৪ টাকা। একই বছরের অক্টোবরে দাম আরও ৬ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯ টাকায়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে দাম আরও ৫ টাকা বেড়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

২০২৪ সালের এপ্রিলের ১৬৭ টাকা থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা বা ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। ৫ লিটারের বোতল কিনলে এই দুই দরের ব্যবধানে ভোক্তাকে প্রতি বোতলে ১৮৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের অক্টোবর প্রকাশিত বাজার প্রতিবেদনে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৫৫ থেকে ১৫৮ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে খোলা সয়াবিনের ঘোষিত দাম ছিল ১৭৭ টাকা এবং বর্তমানে খোলা সয়াবিন প্রতি কেজি ১৮২ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তেলের ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক ও ভ্যাট, পরিশোধন এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। অনেক ব্যবসায়ী আবার লাভ কম হওয়ায় বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন।
মানিকনগরের মুন্না জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী একরাম উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করলে মাত্র ১ টাকা কমিশন পাওয়া যায়। আগে এটি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেত।
এজন্য বোতলজাত সয়াবিন বিক্রিতে আগ্রহ কম বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারপ্রতি বাড়তি ব্যয়ের হিসাব
একটি পরিবারের চাল ও তেলের বাড়তি ব্যয় বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে মাসে ৪০ কেজি চাল ও ৫ লিটার তেল ব্যবহারের হিসাব ধরা যেতে পারে। যদি চালের গড় দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়ে, তাহলে মাসিক বাড়তি ব্যয় হবে ২০০ টাকা; বছরে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
একই পরিবার যদি প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে ২০২৪ সালের এপ্রিলের নির্ধারিত ১৬৭ টাকার পরিবর্তে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকা দেয়, তাহলে পাঁচ লিটার তেলে মাসিক বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে ১৮৫ টাকা; বছরে ২ হাজার ২২০ টাকা।

দুই পণ্যে মিলিয়ে উদাহরণভিত্তিক বাড়তি ব্যয় বছরে ৪ হাজার ৬২০ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে মোট প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। যদি উদাহরণের ৪ হাজার ৬২০ টাকা বাড়তি ব্যয় প্রতিটি পরিবারের ক্ষেত্রে সমান ধরে গুণ করা হয়, তাহলে জাতীয় অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
অর্থাৎ চাল ও ভোজ্যতেলের বাড়তি দামের কারণে ভোক্তার পকেট থেকে যে অতিরিক্ত অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টিত হচ্ছে। এর ক্ষুদ্র অংশ হয়তো ধানচাষি, কৃষক ও উৎপাদক পেতে পারেন। তবে বড় অংশই চালকল মালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, ভোজ্যতেল আমদানিকারক, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশকদের কাছে চলে যাচ্ছে।
দিনশেষে ভোক্তাকে একই পরিমাণ চাল ও তেল কিনতে বেশি টাকা ব্যয় করতে হলে পরিবারের হাতে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের জন্য অর্থ কমে যায়। ফলে তাদের প্রকৃত জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসলে চাল ও তেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চাল বা তেল, দাম বাড়ার পেছনে একটি সিন্ডিকেটের কারসাজি কাজ করে। চাল দেশে উৎপাদিত হয়। চালের বাজার অস্থির হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।
তিনি বলেন, ভোজ্যতেল আমদানির্ভর, ফলে দামের তারতম্য হতে পারে। কিন্তু দাম যতটা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে ব্যবসায়ী মহলের একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে। এখানেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই, যা অপ্রত্যাশিত। দাম বৃদ্ধির জন্য যতটা না মূল্যস্ফীতি দায়ী, তার চেয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি বেশি দায়ী।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি দেশে একধরনের নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। এখনই যদি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে নীরব দুর্ভিক্ষ সরব হয়ে যাবে। শুধু চাল বা তেল নয়, সার, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ, সব সেক্টর নিয়ন্ত্রণহীন। এখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও কৃষকের সারের সঠিক সরবরাহ এবং দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
আরএম/এমএমএইচ
