আমরা প্রতিদিন খাবার খাই, টয়লেট ব্যবহার করি, বাইরে যাই, গণপরিবহনে চলাচল করি, বাজার করি, রোগীর সেবা দিই এবং খাবার তৈরি ও পরিবেশন করি। এসব কাজের মাধ্যমে আমাদের হাত জীবাণু বহন করতে পারে। অথচ প্রয়োজনীয় সময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সহজ একটি অভ্যাস আমরা প্রায়ই অবহেলা করি। এর মূল্য দিতে হয় ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ, চিকিৎসার ব্যয়, কর্মদিবস হারানো এবং শিশুদের স্কুলে অনুপস্থিতির মাধ্যমে।
হাত ধোয়া সাধারণত ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর গুরুত্ব আরও ব্যাপক। এটি পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তা, শ্রমের উৎপাদনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে চিকিৎসার উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যয় পরিবারকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তাই প্রতিরোধযোগ্য সংক্রমণ কমানোর এই সহজ উপায়টির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
অসুস্থতার পেছনে অদৃশ্য খরচ
মল থেকে জীবাণু হাতের মাধ্যমে খাবার ও পানিতে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের অন্যতম প্রধান পথ। টয়লেট ব্যবহারের পর কিংবা শিশুর মল পরিষ্কারের পর হাত ভালোভাবে না ধুলে জীবাণু খাবার, পানির পাত্র, রান্নার সরঞ্জাম বা অন্যের হাতে পৌঁছাতে পারে। একইভাবে বাইরে থেকে ফিরে, অপরিষ্কার বস্তু স্পর্শ করার পর কিংবা কাশি-হাঁচির পর হাত পরিষ্কার না করলে কিছু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। খাবার তৈরি, পরিবেশন ও খাওয়ার আগে হাত না ধুলেও দূষিত হাতের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
এসব সংক্রমণের অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু ওষুধ কেনা বা চিকিৎসকের ফি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থ ব্যক্তি কাজ করতে না পারলে আয় কমে যায়। শিশুর অসুস্থতায় মা-বাবার কাউকে কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে হয়। হাসপাতালে ভর্তি হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত ও পরিচর্যার ব্যয় বাড়ে। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এসব ব্যয় সঞ্চয় ভাঙা, ঋণ করা কিংবা খাবার ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমানোর কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের নিম্ন-আয়ের একটি নগর জনগোষ্ঠী নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় ডায়রিয়ার একটি গুরুতর পর্বের গড় ব্যয় পাওয়া যায় ২,১৪৭ টাকা এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর পর্বের ব্যয় ৪৯৯ টাকা। গবেষকদের হিসাবে, গুরুতর ডায়রিয়ার একটি পর্ব সংশ্লিষ্ট পরিবারের গড় মাসিক আয়ের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান; অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর পর্বের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৪ শতাংশ। এটি নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর গবেষণার ফল, বাংলাদেশের সব পরিবারের গড় ব্যয় নয়। তবে এটি দেখায়, সাধারণ একটি অসুস্থতাও দরিদ্র পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
হাত ধোয়ার সুযোগ ও অভ্যাসের ব্যবধান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৬৮.৬ শতাংশ পরিবারের সদস্যদের এমন হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে পানি ও সাবান বা ডিটারজেন্ট পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের জরিপে এ হার ছিল ৭৪.৮ শতাংশ। দুটি জরিপের প্রকাশিত হিসাবে এই সূচকের অবনতি লক্ষণীয়।
তবে বাড়িতে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকা আর প্রয়োজনীয় সময়ে বাস্তবে হাত ধোয়া এক বিষয় নয়। জরিপের এই সূচক হাত ধোয়ার সুযোগ সম্পর্কে তথ্য দেয়; এটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে কত শতাংশ মানুষ নিয়মিত হাত ধোয়। যেসব পরিবারের এই সুবিধা নেই, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। আর যাদের সুবিধা আছে, তাদের মধ্যে সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
শুধু সচেতনতামূলক পোস্টার, বিজ্ঞাপন বা বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের আয়োজন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিরাপদ পানি, সাবান, উপযুক্ত স্থান এবং নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলার ব্যবস্থা।
রেস্তোরাঁ ও খাদ্যশিল্প: একজনের অবহেলা, অনেকের ক্ষতি
রেস্তোরাঁয় একজন কর্মীর হাত অপরিষ্কার থাকলে জীবাণু খাবার, পরিবেশনের পাত্র বা রান্নার সরঞ্জামের মাধ্যমে বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। তাই খাবার তৈরির আগে, কাঁচা মাছ-মাংস বা সবজি ধরার পর এবং খাবার পরিবেশনের আগে হাত ধোয়া ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও ব্যবসায়িক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ ও পথখাবার বিক্রেতাদের নিয়ে ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৩০০টি রেস্তোরাঁ ও ৬০০ জন পথখাবার বিক্রেতার স্বাস্থ্যবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৯১ শতাংশ রেস্তোরাঁয় গ্রাহকদের হাত ধোয়ার স্থানে সাবান ও পানি থাকলেও কর্মীদের সুবিধাজনক স্থানে এ ব্যবস্থা ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশে।
খাবার তৈরির আগে ৫১৪টি পর্যবেক্ষণ-সুযোগের মধ্যে মাত্র ১৪ বার, অর্থাৎ প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে, রাঁধুনিরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছিলেন। খাবার পরিবেশনের আগেও হাত ধোয়ার চর্চা ছিল অত্যন্ত সীমিত। পর্যবেক্ষণ করা পথখাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে এসব খাবার-পরিচালনার ঘটনায় সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি।
রেস্তোরাঁয় একজন কর্মীর হাত অপরিষ্কার থাকলে জীবাণু খাবার, পরিবেশনের পাত্র বা রান্নার সরঞ্জামের মাধ্যমে বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। তাই খাবার তৈরির আগে, কাঁচা মাছ-মাংস বা সবজি ধরার পর এবং খাবার পরিবেশনের আগে হাত ধোয়া ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও ব্যবসায়িক দায়িত্ব।
এগুলো ২০১৯ সালের গবেষণার ফল; বর্তমান সময়ের সব রেস্তোরাঁ বা বিক্রেতার অবস্থা একই—এমন সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। তবে গবেষণাটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরে, গ্রাহকদের জন্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকলেও খাবার প্রস্তুতকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকতে পারে।
খাদ্যবাহিত অসুস্থতায় ক্রেতার চিকিৎসার ব্যয় হয়, কর্মদিবস নষ্ট হয় এবং ব্যবসার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিক্রি কমে যাওয়া বা ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার মতো আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে। তাই রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যানটিন, হাসপাতালের রান্নাঘর এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পে কর্মীদের জন্য সহজলভ্য হাত ধোয়ার স্থান, সাবান ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্যনিরাপত্তা পরিদর্শনে শুধু অবকাঠামো নয়, কর্মীদের বাস্তব আচরণও যাচাই করতে হবে।
হাসপাতাল: হাতের পরিচ্ছন্নতা রোগীর নিরাপত্তার শর্ত
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী একাধিক রোগীর সংস্পর্শে আসেন। একজন রোগীকে স্পর্শ করার পর বা শরীরের তরলের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকির পর হাত পরিষ্কার না করলে জীবাণু অন্য রোগী কিংবা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নবজাতক, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রোগীদের জন্য এ ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যসেবায় হাতের পরিচ্ছন্নতার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নির্ধারণ করেছে: রোগীকে স্পর্শ করার আগে, পরিষ্কার বা জীবাণুমুক্ত প্রক্রিয়ার আগে, শরীরের তরলের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকির পরে, রোগীকে স্পর্শ করার পরে এবং রোগীর আশপাশের পরিবেশ স্পর্শ করার পরে। গ্লাভস ব্যবহার করলেও প্রয়োজনীয় সময়ে হাত পরিষ্কারের বিকল্প তৈরি হয় না।
স্বাস্থ্যসেবাজনিত সংক্রমণে রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় বাড়তে পারে, অতিরিক্ত পরীক্ষা ও ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে এবং কখনো জীবনহানিও ঘটতে পারে। এসবের ফলে রোগী ও পরিবারের পাশাপাশি হাসপাতালের ব্যয়ও বাড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশের জরুরি ও গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় এমন হাসপাতাল প্রতি ১০০ রোগীর মধ্যে প্রায় ৭ জন এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় প্রায় ১৫ জন অন্তত একটি স্বাস্থ্যসেবাজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হন। এটি বাংলাদেশ-নির্দিষ্ট হার নয়; নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সম্মিলিত চিত্র।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় হাতের পরিচ্ছন্নতা উন্নত করতে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে আনুমানিক ১৬.৫ ডলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে। এই হিসাব আন্তর্জাতিক পর্যায়ের; বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রযোজ্য সাশ্রয়ের হার নয়। তবে এটি হাতের পরিচ্ছন্নতাকে ব্যয়-সাশ্রয়ী রোগ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে বিবেচনার যৌক্তিকতা তুলে ধরে।
হাত ধোয়ার সুফল শুধু যে ব্যক্তি হাত ধুচ্ছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংক্রমণের ঝুঁকি কমলে পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, সহপাঠী, রোগী ও খাবারের ক্রেতারাও উপকৃত হন। অর্থনীতির ভাষায়, এটি এমন একটি সামাজিক সুফল, যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগীর সেবা দেওয়ার স্থানে হাত পরিষ্কারের উপকরণ, পানি ও সাবানের নিয়মিত সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব চর্চার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। হাতের পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তার অন্যতম সূচক হওয়া প্রয়োজন।
হাত ধোয়া কেন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ?
হাত ধোয়ার সুফল শুধু যে ব্যক্তি হাত ধুচ্ছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংক্রমণের ঝুঁকি কমলে পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, সহপাঠী, রোগী ও খাবারের ক্রেতারাও উপকৃত হন। অর্থনীতির ভাষায়, এটি এমন একটি সামাজিক সুফল, যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
সাবান কেনা বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা তৈরির ব্যয় তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান। অন্যদিকে প্রতিরোধ করা অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয়, বাঁচানো কর্মঘণ্টা এবং এড়ানো সংক্রমণের সুফল অনেক সময় চোখে পড়ে না। ফলে পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকতে পারে। এ কারণেই হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে হাত না ধোয়ার কারণে বছরে কতজন অসুস্থ হন, কত কর্মদিবস নষ্ট হয়, চিকিৎসায় কত টাকা ব্যয় হয় এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে কত টাকা সাশ্রয় সম্ভব—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত গবেষণা দরকার। রোগের বোঝা, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি এবং স্বাস্থ্যসেবাজনিত সংক্রমণের তথ্য একত্র করে অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব তৈরি করা যেতে পারে।
নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব না থাকায় ক্ষতির সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা সম্ভব নয়; কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমায় না।
করণীয়: অভ্যাসের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব
প্রথমত, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, গণশৌচাগার, বাস টার্মিনাল, কর্মক্ষেত্র ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পানি ও সাবানসহ কার্যকর হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাজেট রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আচরণ পরিবর্তনের উদ্যোগকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার তৈরির আগে, খাওয়ার আগে বা অন্যকে খাওয়ানোর আগে এবং হাত দৃশ্যত নোংরা হলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাইরে থেকে ফিরে এবং কাশি-হাঁচি বা নাক পরিষ্কারের পর হাত ধোয়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এ অভ্যাস শেখাতে হবে।
তৃতীয়ত, রেস্তোরাঁ, পথখাবারের দোকান ও খাদ্যশিল্পে কর্মীদের হাত ধোয়ার উপযুক্ত স্থান, সাবান ও পানি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শনের পাশাপাশি নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি যাচাই করতে হবে। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণ না দিয়ে শুধু কর্মীদের দায়ী করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
চতুর্থত, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাতের পরিচ্ছন্নতাকে সংক্রমণ প্রতিরোধ কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং সংক্রমণের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি হাসপাতালের মান মূল্যায়নেও এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, সরকারকে জাতীয় জরিপ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে হাত ধোয়ার সুযোগ এবং বাস্তব আচরণ—দুটিরই অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে। একই সঙ্গে হাত না ধোয়ার কারণে রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণে গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে।
ছোট অভ্যাস, বড় সুরক্ষা
বাংলাদেশে হাত না ধোয়ার কারণে জাতীয় অর্থনীতির মোট ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে গবেষণা দেখায়, ডায়রিয়ার একটি পর্বও নিম্ন-আয়ের পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যয় তৈরি করতে পারে; খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনে হাতের পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়; আর স্বাস্থ্যসেবায় হাত পরিষ্কার না রাখলে রোগী ও চিকিৎসাব্যবস্থা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই হাত ধোয়াকে শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পরামর্শ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পারিবারিক আর্থিক সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য, রোগীর নিরাপত্তা এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতা রক্ষার একটি মৌলিক উপায়। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসায় অর্থ ব্যয় করার চেয়ে অসুস্থতা প্রতিরোধে অল্প বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই অধিক যুক্তিসংগত।
সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নয়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক অভ্যাস, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। ব্যক্তিগত অভ্যাসকে সামাজিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারলে এর সুফল ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল, বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ : অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
