প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা, নভেম্বরে বৈঠকের আলোচনা; তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত ও শেখ হাসিনার অবস্থানসহ অমীমাংসিত ইস্যুতে সমাধানের অপেক্ষা
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আগামী নভেম্বরে এ সফর হতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও এখনো তারিখ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়নি।
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকের আগে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য বৈঠকটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
ক্ষমতার পালাবদলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন আসে, তার ধারাবাহিকতায় দেশে ফেরেন তিনি।
এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। নতুন সরকারের সামনে এখন রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন মতপার্থক্য দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছিল। নতুন সরকারের সময় সেই দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে কূটনৈতিক যোগাযোগ
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যায়। তাঁর জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তাঁর হাতে তুলে দেন।
অন্যদিকে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। দুই দেশের এই কূটনৈতিক যোগাযোগকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান মোদি। টেলিফোনে কথোপকথনের পাশাপাশি তিনি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তাও দেন। দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার এবং অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমনটি মনে করার কারণ নেই। বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন করে আলোচনা শুরুর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্পর্ক জোরদারে কূটনৈতিক তৎপরতা
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে নয়াদিল্লির বাড়তি মনোযোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ভারতের সম্মতি পাওয়ার খবর এসেছে। তিনি এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। রিয়াজ হামিদুল্লাহ জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভারতের আমন্ত্রণ খোলা রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ জন্য দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুকূল পরিবেশ থাকা জরুরি।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া বৈঠক আয়োজনের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ভিত্তি তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সংবাদ শিরোনাম তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের অগ্রগতি নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
তিস্তা, সীমান্ত ও শেখ হাসিনা নিয়ে মতপার্থক্য
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, ভিসা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ।
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি। অন্যদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইস্যু পাশ কাটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করলে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বরং দুই দেশের উদ্বেগ ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য পানি, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সুবিধার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। সব দাবি পূরণ করা সম্ভব না হলেও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে অগ্রগতি অর্জন দুই দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে বাংলাদেশে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ঐক্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তবে এ ধরনের বক্তব্যের বাস্তব কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সমান নাগরিক অধিকার এবং আইনের সমান প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর। দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়াতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও নিয়মিত আলোচনার অংশ হওয়া জরুরি।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগে সহযোগিতার সুযোগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক কার্যকরভাবে এগিয়ে গেলে উভয় দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা বাণিজ্যের ব্যয় কমাতে এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসাব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ হবে। বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সমাধানের পথও তৈরি করা সম্ভব।
তবে এ ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে এই অবস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
আনুষ্ঠানিক করমর্দনের চেয়ে বড় পরীক্ষা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সফরটি নভেম্বরে হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দুই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত সফরটিকে আলোচনাধীন হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
দিল্লিতে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠক নিঃসন্দেহে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু দুই নেতার করমর্দন কিংবা যৌথ ছবি তোলাই সম্পর্কের সাফল্যের মাপকাঠি নয়।
প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে দুই দেশ শুভেচ্ছাকে কার্যকর চুক্তিতে, মতপার্থক্যকে আলোচনায় এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে কি না, তার ওপর।
বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে নতুন করে আস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য, পারস্পরিক সম্মান, বাস্তবসম্মত সমঝোতা এবং দুই দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
এমএ
