খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না, এমন সব খুদে জীবের ছবি তোলেন কুতুব উদ্দিন। তেমনই এক জাতের অণুজীব স্লাইম মোল্ডের ছবি তুলে এবার জিতেছেন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতার পোর্টফোলিও পুরস্কার। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই বাংলাদেশির গল্প শোনাচ্ছেন সজীব মিয়া
কুতুব উদ্দিনের পুরস্কারজয়ী গুচ্ছ ছবিগুলোর নাম ‘সিক্রেট ওয়ার্ল্ড’। ছয়টি ছবিতে উঠে এসেছে স্লাইম মোল্ডের প্রজননকাঠামো। স্লাইম মোল্ড ছত্রাকের মতো দেখতে একধরনের জীব, যা পচা কাঠসহ আর্দ্র পরিবেশে জন্মে। এদের আকার মাত্র ১ থেকে ২ মিলিমিটার। খালি চোখে সহজে নজরে পড়ে না। ম্যাক্রো লেন্সের সাহায্যে এদের সূক্ষ্ম গঠন, রং ও বিন্যাস ক্যামেরায় ধরেছেন কুতুব।
সিরিজের একটি ছবির নাম ‘টাইনি ড্যান্সার’ বা ‘খুদে নৃত্যশিল্পী’। হলুদাভ পিচ্ছিল স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সরু লালচে-বাদামি ডাঁটা। প্রতিটির মাথায় হলুদাভ গোলাকার অংশের ওপর ছড়িয়ে আছে কালো ছোপ। পচা কাঠের ওপর জন্মানো স্লাইম মোল্ডগুলোকে দেখে মনে হয় যেন নাচছে।
আরেকটি ছবির নাম ‘আ ওয়ার্ল্ড ইন মিনিয়েচার’ বা ‘ক্ষুদ্র এক জগৎ’। এতে ফুটে ওঠা স্লাইম মোল্ডটি শর্ষের দানার সমান। দেখতে অনেকটা বনসাই করা গাছের মতো, মাথায় যেন ফুটে আছে সাদা ফুল।
২০২৬ সালে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ৬২তম ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতার পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন জায়গায় ছবিগুলো তোলা।

শখ থেকে পেশাদার আলোকচিত্রী
২০১২ সালে জন্মদিনে কুতুব উদ্দিনকে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা উপহার দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী জমিলা পারভিন। সেই শুরু। প্রথম দিকে প্রজাপতি, মৌমাছি, ফুল, পাখি ও আশপাশের প্রকৃতির ছবি তুলতেন। তখনো আলোকচিত্র ছিল শখের বিষয়। উদ্দেশ্য ছিল সুন্দর ছবি তোলা। একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি ম্যানের কাজ করতেন, পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন আলোকচিত্রে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা। বিভিন্ন লেখা পড়ে, ইউটিউবে অন্য আলোকচিত্রীদের কাজ দেখে নিজের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখেছেন ছবি তোলার কৌশল।
ছবি তুলতে তুলতেই প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ বাড়ে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, আলোকচিত্র শুধু সুন্দর দৃশ্য ধরে রাখার মাধ্যম নয়, এর সাহায্যে এমন গল্পও বলা যায়, যা মানুষের অজানা। একসময় ছবি তোলাকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৮ সাল থেকে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন কুতুব। ছবি বিক্রি, আলোকচিত্রের কর্মশালা পরিচালনা এবং অন্যদের ছবি তোলা শেখানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের পরিচিতি। তবে শখকে পেশায় পরিণত করাটা সহজ ছিল না। কুতুবের ভাষায়, ‘নিজের ভালোবাসার কাজকে পেশা হিসেবে নিতে পারাকে আমি সৌভাগ্য মনে করি। তবে শুধু ভালো ছবি তুলতে পারলেই হয় না। নিজের কাজের প্রচার, গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসার দিকটিও সামলাতে হয়।’

ক্ষুদ্র জগতের প্রতি মুগ্ধতা
প্রকৃতির নানা ধরনের ছবি তুলতে তুলতেই ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ। ছোট্ট একটি পোকামাকড়ের শরীর, চোখ কিংবা পায়ের সূক্ষ্ম গঠন ক্যামেরায় দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। আর এখন তো সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘ম্যাক্রোম্যান’ পরিচয় দেন কুতুব, ‘ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই নাম। ছোট ছোট পোকামাকড়, ছত্রাক, স্লাইম মোল্ড এবং তাদের সূক্ষ্ম গঠন আমার আগ্রহের বিষয়।’ ছত্রাকের এমন সব গঠনও তাঁর চোখে পড়ে, সাধারণভাবে যা দেখা সম্ভব না।
কুতুবের কাছে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, পরিচিত পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখা যায়। আমরা প্রতিদিন জঙ্গলে হাঁটি, গাছের গুঁড়ি দেখি, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে চলি। কিন্তু সেই কাঠের ওপর কিংবা পাতার নিচে কী ঘটছে, অনেক সময় তা খেয়াল করি না। ম্যাক্রো লেন্সে সেই ক্ষুদ্র জগৎ সামনে চলে আসে। কোনো কোনো জীবের গঠন দেখে মনে হয়, যেন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী।
এই জগৎ আবিষ্কার করতে কুতুব উদ্দিনকে খুব দূরে যেতে হয় না। পশ্চিম সাসেক্সে তাঁর বাড়ির কাছেই মনোরম বন স্লিন্ডন উডস। এ ছাড়া পুলবরো ব্রুকস, হেসওর্থ কমনসহ আশপাশের বিভিন্ন বনভূমিতেও তিনি যান। বিশেষ করে বৃষ্টির পর ভেজা জঙ্গলে যেতে পছন্দ করেন। আর্দ্র পরিবেশে স্লাইম মোল্ড ও বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বেশি।

ছবি তোলার জন্য ক্যানন আর ৫ ক্যামেরা ও ক্যানন এমপি-ই ৬৫ মিলিমিটার ম্যাক্রো লেন্স ব্যবহার করেন কুতুব। এই লেন্স দিয়ে এক থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বড় করে ছবি তোলা যায়। আলোর নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করেন ছোট এলইডি বাতি ও ডিফিউজার। ছবি তোলার পর বিভিন্ন ফোকাস পয়েন্টে ধারণ করা ছবিগুলো জেরিন স্ট্যাকার সফটওয়্যারে একত্র করেন। ভালো একটি ছবির জন্য কখনো ৫০, ১০০ কিংবা তারও বেশি ছবি তুলতে হয়। তাঁর একটি পুরস্কারজয়ী ছবির জন্য ব্যবহার করতে হয়েছিল ১২৪টি ছবি।
কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তবে সরঞ্জামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণ। জঙ্গলে গিয়ে শুধু সামনে তাকিয়ে হাঁটি না। মাটির কাছাকাছি, গাছের গুঁড়ি, পচা কাঠ, পাতার নিচে এবং ভেজা জায়গায় মনোযোগ দিয়ে খুঁজি। কোথায় আর্দ্রতা বেশি, কোথায় কাঠ পচছে, কোথায় ক্ষুদ্র জীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে, এসব লক্ষ করি।’

জীবের নাম স্লাইম মোল্ড
২০২৪ সালের অক্টোবরের দিকে স্লাইম মোল্ড নিয়ে কাজ শুরু করেন কুতুব উদ্দিন। অ্যালিসন নামের এক আলোকচিত্রীর ইউটিউব ভিডিও ও ইনস্টাগ্রামে তাঁর কাজ দেখে বিষয়টির প্রতি আগ্রহী হন। এরপর স্লাইম মোল্ড খুঁজে বের করা, ছবি তোলা এবং এদের জীবনচক্র সম্পর্কে জানার পেছনে সময় দিতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের প্রায় পুরোটা সময় এদের নিয়ে কাজ করেছেন কুতুব। জঙ্গলে ঘুরেছেন, তাদের জীবনচক্র বোঝার চেষ্টা করেছেন, তুলেছেন ছবি। সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানেরই স্বীকৃতি এনে দিয়েছে এই ছয় ছবি। ২০২৫ সালেও ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁর একটি ছবি ‘হাইলি কমেন্ডেড’ স্বীকৃতি পেয়েছিল। আর এবার পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হওয়া তাঁর কাজের নতুন অধ্যায়।
তাঁর পুরস্কারজয়ী ছবিগুলো এখন লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে নিজের ছবি প্রদর্শিত হতে দেখা অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দর্শক ছবিগুলো দেখছেন। দর্শনার্থীদের অনেকে স্লাইম মোল্ড সম্পর্কে জানতেন না। অনেকে জানতে চান, এটা কী কিংবা কীভাবে এমন ছবি তোলা সম্ভব। দর্শকদের প্রশ্ন শুনে নিজের কাজ সার্থক বলে মনে হয়।’

কুতুব চান, তাঁর ছবি দেখে মানুষ শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করবেন না, প্রকৃতির ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ জীবগুলো সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হবেন। বন্য প্রাণীর আলোকচিত্র মানেই শুধু বাঘ, সিংহ কিংবা বড় প্রাণীর ছবি না। ক্ষুদ্র জীবও অসাধারণ গল্প বলতে পারে।
শিকড়ের টান
কুতুব উদ্দিনের জন্ম মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। পড়াশোনার জন্য ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে যান তিনি। ভাইবোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশে থাকেন। মাকে আগেই হারিয়েছিলেন, কয়েক মাস আগে মারা গেছেন তাঁর বাবা।
আগামী বছর বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এবার তাঁর বিশেষ আগ্রহ দেশের প্রকৃতিতে স্লাইম মোল্ড ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জীব খুঁজে সেগুলোর ছবি তোলা। কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘এমন কিছু প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যুক্তরাজ্যে খুঁজে পাইনি। তাই দেশে ফিরে সেগুলো আবিষ্কার করতে চাই।’
পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন বনভূমিতে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রকৃতিতে কাজে লাগাতে চান তিনি।
