শুরু হলো বাংলা বছরের কার্তিক মাস। ষড়ঋতুর পালাবদলে বছর ঘুরে এখন হেমন্তকাল। কাল হেমন্ত হলেও প্রভাতে শিশির ভেজা ঘাস আর সামান্য কুয়াশার আবরণ জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। এ সময়ে একটি মাত্র প্রবাদ-‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা যশোরের মাঠ-ঘাট আর মেঠোপথকে এক আশ্চর্য মায়াজালে বেঁধে ফেলে। হিমেল হাওয়া যখন কড়া নাড়ে, তখন যশোরের গ্রাম-বাংলায় শুরু হয় এক রোমান্টিক কর্মযজ্ঞ। দা-দড়ি হাতে গাছিদের খেজুর গাছে ওঠার দৃশ্য, গাছ তোলা, চাঁছা, কাটা, গাছ থেকে রস নামিয়ে মাটির ভাঁড় ভরে মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফেরা, আর বাড়ির উঠোনে উনুনে রস জ্বালানোর সময় ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যাওয়া রসের মিষ্টি সুবাস—সব মিলিয়ে এ যেন এক রসালো উৎসবের কাব্যগাথা।
শীতের আগমনী বার্তায় যশোরের ঐতিহ্য খেজুরের রস সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় নেমে পড়েছেন গাছিরা। অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছে এখন চলছে গাছিদের শৈল্পিক হাতের পরিচর্যার প্রথম ধাপ-খেজুর গাছ তোলা; যা রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুতের প্রথম ধাপ। কয়েক ধাপ পেরিয়ে সপ্তাহ তিনেক পর রস আহরণ শুরু হবে। তখন গাছিরা ধারালো দা-এর সাহায্যে কেটে গাছের বুক বিদীর্ণ করে বের করে আনবেন মিঠা রস। তার ক’দিন পর পুরোপুরি শীত এলেই পাওয়া যাবে সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালির স্বাদ, সঙ্গে লোভনীয় পিঠা-পায়েস; যার খ্যাতি দেশজুড়ে।
হেমন্তের কয়েকটা মিঠে রোদ গায়ে মেখে এক চুমুক কাঁচা রসে যে তীব্র সুখ, তার কাছে পৃথিবীর সব কৃত্রিম পানীয়ই যেন ফিকে হয়ে যায়। তাই মানুষের ঠোঁটে ভেসে ওঠে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস, খালি পেটে খেলে পরে মন হবে বশ!’
কাঁচা রস জ্বালাতে জ্বালাতে ঘন হতে থকে। তখন তার রংও বদলায়। নির্দিষ্ট পর্যায়ে তৈরি হয় চুনো গুড়, ঝোলা গুড় কিংবা নলেন গুড়। সেই গুড় কাঠের বা মাটির ছাঁচে ঢেলে রাখলে ঠাণ্ডা হয়ে তৈরি হয় জমাট বাঁধা ‘পাটালি’। এর ঘ্রাণ আর স্বাদে বন্দি হয়ে যায় শীতকাল। এই গুড়ের ছোঁয়ায় ভাপা, চিতই, আর দুধে ভেজানো রসা-পিঠার যে আয়োজন, তা নবান্নের শ্রেষ্ঠ উপহার। এই নান্দনিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে যশোরের এক বিশাল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী এই খেজুর গুড় লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি। রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতির পর থেকে শীত মৌসুমে জেলাজুড়ে রস ও গুড় উৎপাদনে দেখা দিয়েছে উদ্দীপনা। ‘যশোরের এই যশ,-কে পুঁজি করে এবার আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন এ অঞ্চলের মানুষ।
যশোর কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বোচ্চ গুড় উৎপাদনকারী এই জেলায় বর্তমানে খেজুর গাছ রয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে রস আহরণের উপযোগী গাছ ১৩ লাখ ৭ হাজার ১৩০টি। সূত্রমতে, একটি গাছ থেকে মৌসুমে রস পাওয়া যায় গড়ে ২০ কেজি। এ থেকে তৈরি হয় প্রায় ৮ কেজি গুড়। হিসাবমতে, জেলায় মৌসুমে গুড় উৎপাদিত হয় প্রায় ৯৫ লাখ কেজি বা সাড়ে ৯ হাজার টন। সূত্রমতে, মানভেদে প্রতি কেজি গুড়ের দাম ২০০ টাকা হিসাবে বাজারমূল্যে দাঁড়ায় ১৯০ কোটি টাকা।
ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। আগে গাছিরা স্থানীয় বাজারে গিয়ে গুড় বিক্রি করতেন। ব্যাপারীরা তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যেতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে ব্যাপারীরা কম দামে কিনে অনেক বেশি দামে বিক্রি করতেন। গাছিদের হাড়ভাঙা খাটনির ফসলের বেশি সুফলভোগী হতেন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারীরা; কিন্তু এখন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা ই-কমার্সের মাধ্যমে সরাসরি ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটের সাহায্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রেতাদের কাছে খাঁটি রস, গুড় ও পাটালি পৌঁছে দিচ্ছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে এবং কৃষক সরাসরি বেশি লাভবান হচ্ছেন।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, আমরা গাছিদের উন্নত ও নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহের জন্য বিশেষ উঠান বৈঠক করে নেট বিতরণ করছি। মাটির কলসের মুখে বিশেষ জাল ব্যবহার করে রস সংগ্রহ করার জন্য গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাদুড় বা অন্য কোনো পাখি রস দূষিত করতে না পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যশোরের এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় নতুন করে বিপুল পরিমাণ খেজুরের চারা রোপণ করা জরুরি।
