হেমন্তের ভোর। চারদিকে তখনো শিশিরের কোমল পরশ। সবুজ ফসলের মাঠের ওপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সকালের আলো। গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই চোখে পড়ে একঝাঁক রঙিন পাখির ওড়াউড়ি। কখনো তারা ফসলের শিষে বসে খাবার খুঁজছে, কখনো ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে পাশের জমিতে। মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে মাঠের চেনা দৃশ্য। সবুজের বুকজুড়ে যেন ছড়িয়ে পড়ছে রঙের উৎসব। পাখির এই আনাগোনা শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদেরই মুগ্ধ করছে না, ফসলের মাঠেও যোগ করছে এক ভিন্ন তাৎপর্য। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পাখিরা প্রাকৃতিকভাবে ফসলের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই দৃশ্যের টানেই এখন নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের দোনইল গ্রামের ফসলের মাঠে ছুটে আসছেন পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীরা। কারো হাতে দামি ক্যামেরা, কারো হাতে ভিডিও ধারণের সরঞ্জাম। কেউ অপেক্ষা করছেন পাখির ডানা মেলার মুহূর্তটির জন্য, কেউ আবার ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করতে চাইছেন ঠোঁটে খাবার নিয়ে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য।
ভোরে দোনইল গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, হীরামণ টিয়ার দল কখনো ফসলের শিষে বসছে, কখনো খাবার খেয়ে উড়ে যাচ্ছে এক জমি থেকে অন্য জমিতে। পাখিগুলোর এমন স্বাভাবিক বিচরণ দেখতে দেখতে কখন যে সময় পেরিয়ে যায়, তা যেন টেরই পান না দর্শনার্থীরা।
জয়পুরহাট থেকে এসেছেন ফটোগ্রাফার সোহেল রানা। তিনি এসেছেন ভোরের আলোয় পাখির ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে। তার চোখে-মুখে তখন আনন্দের ছাপ। তিনি বলেন, খুব ভোরে বদলগাছীর ফসলের মাঠে এসেছেন হীরামণ টিয়ার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে। পাখিগুলোর ওড়াউড়ি, খাবার খাওয়া এবং মাঠজুড়ে বিচরণের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত।
আক্কেলপুর উপজেলা থেকে আসা পাখিপ্রেমী রাজনের অভিজ্ঞতা আবার অন্য রকম। পাখির দেখা পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা। সকাল সাতটার দিকে অবশেষে দেখা মেলে কাক্সিক্ষত হীরামণ টিয়ার দলের। রাজন বলেন, ধানখেত থেকে শিষ নিয়ে অন্য ফসলের মাঠে উড়ে যাচ্ছে পাখিগুলো। তাদের খাবার খাওয়া আর দল বেঁধে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার অনুভূতিই আলাদা।
শুধু জয়পুরহাট কিংবা আক্কেলপুর নয়, ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাখির এই সৌন্দর্য দেখতে আসছে মানুষ। কেউ আসছেন শখের বশে, কেউ প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে, আবার কেউ পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে পাখির বিরল মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখতে।
ব্যস্ত শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এই ফসলের মাঠ যেন তাদের কাছে এক টুকরো প্রশান্তির ঠিকানা। পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য আর হেমন্তের স্নিগ্ধ সকাল মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক মায়াবী পরিবেশ। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ছে সেই সৌন্দর্যের নানা মুহূর্ত। আর প্রতিটি ছবির পেছনে জমা হচ্ছে অপেক্ষা, ধৈর্য ও মুগ্ধতার গল্প। দোনইল গ্রামের স্কুলশিক্ষক ও ফটোগ্রাফার সঞ্জয় কুমার বেশ কয়েক মাস ধরে এই মাঠে হীরামণ টিয়ার বিচরণ লক্ষ করছেন। তার ভাষ্য, দোনইল ও মহদীপুর এলাকার ফসলের মাঠে নিয়মিত দেখা মিলছে পাখিগুলোর। ভোর ছয়টা থেকে সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত খাবার খাওয়ার পর তারা অন্যত্র চলে যায়। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আবার তাদের দেখা পাওয়া যায়। সঞ্জয় কুমার বলেন, পাখির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফাররা আসছেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ক্যামেরা নিয়ে হাজির হচ্ছেন মাঠে। তাদের অপেক্ষা একটাইÑ পাখির স্বাভাবিক চলাফেরার মধ্যে থেকে সুন্দর একটি মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া।
তবে এই মাঠে হীরামণ টিয়ার সমাগমের পেছনে রয়েছে এক তরুণের ভালোবাসা ও উদ্যোগের গল্প। গ্রামের পাখিপ্রেমী যুবক আরিফ আফরান নিজের খরচে জমিতে চাষ করেছেন বিদেশি জনসন ঘাস। সেই ঘাস খেতেই প্রতিদিন ভোরে আসে হীরামণ টিয়ার দল। ঘাসের জমি ঘিরে পাখিদের এই নিয়মিত আনাগোনা ধীরে ধীরে পরিচিত করে তুলেছে এলাকাটিকে।
আরিফ আফরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন ফটোগ্রাফার এই মাঠে আসেন। এখন পর্যন্ত শতাধিক আলোকচিত্রী এসেছেন হীরামণ টিয়ার ছবি তুলতে। তাদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে পাখির ওড়াউড়ি, খাবার সংগ্রহ এবং দলবদ্ধ বিচরণের অসংখ্য মুহূর্ত।
পাখির এই উপস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলের মাঠের উপকার করে। ধানগাছ ও শিষের ক্ষতি করে এমন কিছু পোকামাকড় পাখির খাদ্য হলে ফসলের ক্ষতি কমতে পারে। এতে কৃষকের জন্যও তৈরি হয় সম্ভাব্য সুফল। তবে হীরামণ টিয়া ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতিকর পোকা খাচ্ছে এবং তাতে ধানের ক্ষতি কতটা কমছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
একটি জমিতে ঘাসের চাষÑ সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে প্রকৃতিপ্রেমীদের মিলনস্থল। আরিফের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতির প্রতি সামান্য ভালোবাসা ও যতœও কত মানুষের মনে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে পাখিদের স্বাভাবিক বিচরণ বজায় রাখতে তাদের নিরাপদ দূরত্ব থেকে পর্যবেক্ষণ করা, অযথা শব্দ না করা এবং কোনোভাবেই বিরক্ত না করাও জরুরি। বদলগাছীর দোনইল গ্রামের এই ফসলের মাঠ এখন যেন সবুজের মাঝে রঙিন এক মঞ্চ। সেখানে প্রতিদিন প্রকৃতি সাজায় নতুন দৃশ্য, পাখিরা মেলে ধরে ডানা, আর ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো অপেক্ষা করেন সেই সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য।
হেমন্তের আকাশে হীরামণ টিয়ার উড়ে যাওয়া, সবুজ ফসলের ওপর তাদের ছায়া পড়া কিংবা ঠোঁটে খাবার নিয়ে দূরে মিলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যÑ সব মিলিয়ে বদলগাছীর প্রকৃতিতে যোগ হয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য দেখতে যারা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন, তারা শুধু কিছু ছবি নিয়ে ফিরছেন না; ফিরছেন প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো কিছু মুগ্ধতার মুহূর্ত নিয়ে।
আর দোনইলের মাঠে প্রতিদিন ভোরে পাখিরা যখন আবার ফিরে আসে, তখন নতুন করে শুরু হয় সেই অপেক্ষাÑ কখন ডানা মেলে উড়বে হীরামণ টিয়ার দল, কখন সবুজ ফসলের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে রঙিন এক সকাল। পাখির এই আনাগোনা প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৃষিজমিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বও মনে করিয়ে দেয়।
