ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে আটকা পড়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি। তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করানো হচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে নির্যাতন। প্রতারিত এসব কর্মীর অনেকে পালানোর চেষ্টা করেও বিপাকে পড়েছেন। কারণ অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা, আর্থিক সংকট ও জরিমানার আশঙ্কায় তাদের দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এসব সমস্যার সমাধান না হলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
ভুক্তভোগীদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কম্বোডিয়ায় এখনো ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটকে আছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনের দেশে ফেরা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত ৩ সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের বিমানবন্দরে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে গিয়ে অভিবাসন পুলিশের হাতে আটক হন ৩২ বাংলাদেশি। তাদের কয়েকজনকে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে দুজন মুক্তি পেলেও বাকি ৩০ জনকে ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। পরে দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে তারা মুক্তি ও দেশে ফেরার অনুমতি পেয়েছেন।
ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) জহির ইমাম জানান, মুক্তি পাওয়া ৩০ জনের অনেকে দেশে ফেরার অনুমতিপত্র পেয়েছেন এবং টিকিটও কেটেছেন। শিগগির তারা দেশে ফিরবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। কিন্তু ফেরার টিকিটের খরচ বহন করতে হবে ভুক্তভোগীদের। এমন পরিস্থিতিতে অর্থসংকটে তাদের ফেরা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ব্যাংকক দূতাবাসের প্রথম সচিব জানান, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া ১ হাজার ৭৯৬ জন বাংলাদেশির বিষয়ে ফোনকল, ই-মেইল, সরাসরি আবেদন এবং প্রবাসীদের মাধ্যমে সহায়তার অনুরোধ এসেছে। গত জুলাই থেকে প্রায় ৩৫০-৪০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে তালিকাভুক্ত সবার নাম যাচাই করা যায়নি। তাদের বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় ব্যাংককের দূতাবাসের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় কাজের জন্য ১৫ হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে এত কর্মী যাওয়ার পর তারা কোথায় আছেন এবং কী কাজ করছেন, তা জানার কার্যকর ব্যবস্থা কেন নেই বলে জানিয়েছেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান।
গত বৃহস্পতিবার থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে প্রতারণার শিকার ৩৮ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর আগে গত জুনে ফিরেছিলেন ৫৮৩ জন। কম্বোডিয়া সরকার ১ সেপ্টেম্বর থেকে জরিমানা ছাড়া অতিরিক্ত সময় অবস্থানরত বিদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়ার পর সর্বশেষ ৩৮ জন ফেরেন। দেশে ফেরাদের জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও বাড়ি পৌঁছাতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের বরাতে ব্র্যাকের কর্মকর্তারা জানান, উন্নত দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়ায় নিয়ে অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হয়। তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের ফেরার পথেও ভয়ভীতি দেখানো ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে মিয়ানমারের সাইবার প্রতারণাকেন্দ্র থেকে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন এবং চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আটজন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদেরও চাকরির প্রলোভনে থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে মিয়ানমারে নেওয়া হয়। সেখানে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়।
গত ৮ অক্টোবর কম্বোডিয়া থেকে তিন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়। তাদের একজন ঝিনাইদহের ২৩ বছর বয়সি সোহাগ আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর তিনি একটি প্রতারণাকেন্দ্রে আটকে পড়েন।
সব মিলিয়ে কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। তাদের অবস্থান শনাক্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, আর্থিক সহায়তা এবং অভিবাসন জটিলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশে ফেরার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।