বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি চলছিল। তা থেকে বাঁচতে সপ্তমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপে প্রবেশ করতে চাইছিলেন দর্শনার্থীরা। তদন্তকারী পুলিশ জানতে পেরেছে, সে সময় ‘মণ্ডপ ভাঙছে’ বলে একটি ঘোষণা হয়েছিল। অভিযোগ, তাতেই বিপত্তি। গত শনিবারের সেই ঘোষণার জন্য সঞ্জীব রাহা নামে এক ব্যক্তিকে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার সকালে হেয়ার স্ট্রিট থানায় গিয়ে ধরা দেন দ্বিতীয় ঘোষক কুশল মজুমদার। গ্রেফতার হওয়ার পরে তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চোখে পড়ে কিছু পোস্ট। কে সেগুলি করেছিল স্পষ্ট নয়। তবে সেই পোস্টে ধৃত দাবি করেন, ‘পুলিশের এক জনের’ কথাতেই তিনি সেই ঘোষণা করেছিলেন।
শনিবার চোরবাগানের প্রতিমা নিরঞ্জন করার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার চোরবাগান পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন করার পরে সিটের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী জানিয়েছিলেন, প্রতিমা নিরঞ্জন করা গেলেও প্যান্ডেল রেখে দেওয়া হবে। তদন্তে নেমে পুলিশের কাছে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। সূত্রের খবর, চোরবাগানের মণ্ডপ থেকে বাইরে বার হওয়ার পথে বেশ কয়েকটি স্টল বসানো হয়েছিল। তার কোনও অনুমতি ছিল না বলেই জানতে পেরেছে পুলিশ। এই স্টলগুলি রাস্তার অনেকটা অংশ জুড়ে বসানো হয়েছিল। তাতে প্রবেশ ফটকের পার হওয়ার পরের রাস্তা সরু হয়ে গিয়েছিল।
পুজোর আগে কমিটির তরফ থেকে যখন অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়, তখন বিস্তারিত ভাবে জানাতে হয় কী বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। পুজোর আগে কমিটির তরফ থেকে পুলিশ প্রশাসনকে কী কী তথ্য জানানো হয়েছিল, সেই তথ্য হাতে পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনার সময় প্যান্ডেলের গেটে দড়ি ছেড়ে দেওয়ার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রাথমিক ভাবে তদন্তকারীরা জেনেছেন বলে খবর। প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, সপ্তমীর সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামায় হোমগার্ডের দড়ি ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলেই সেই বিপত্তি।
মণ্ডপের ভিতরের বসানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সূত্রের খবর, প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের ভিতরের গোলাকৃতি জায়গার অনেকটাই ফাঁকা ছিল। ঘটনার সময়ে প্রস্থান ফটকে ভিড় জমে থাকতে দেখা গিয়েছে। সে সময় প্রবেশ পথের দিক থেকে পুলিশ দর্শনার্থীদের বার করে দিচ্ছেন বলেও দেখা গিয়েছে।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর সমাজমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সেই সব ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম। এমনই এক ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছিল, গ্রিলে ঘেরা ঘোরানো উড়ালপথের উপরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন দর্শনার্থী। অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, বাইরে যাওয়ার গেট থেকে মণ্ডপের ৮-১০ মিটার ভিতরে প্রবল ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাটিতে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন। আতঙ্কে অনেকে চিৎকার করছেন। এক পুলিশকর্মী ক্রমাগত কাউকে ফোন করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন। তাঁকে ধরে এক জন মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই মণ্ডপ থেকে কেউ মাইকে ঘোষণা করেন, ‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে।’’
সেই ঘোষণায় সবাইকে দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। মাইকের ওই ঘোষণায় আরও আতঙ্ক ছড়ায় দর্শনার্থীদের মধ্যে। আরও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। বৃষ্টির কারণে প্রস্থান ফটকে ভিড় এবং হঠাৎ করে ঠেলাঠেলি, ভুল ঘোষণা— এই সব ঘটনার সময় এবং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্রের খবর, মণ্ডপ এমন ভাবে করা হয়েছিল, যাতে বাইরের শব্দ ভিতরে না ঢুকতে পারে। সেক্ষেত্রে ঘোষণার প্রভাব কখন এবং কী ভাবে হতে পারে, তা-ও তদন্তাধীন।
চোরবাগানে পুলিশ, হোমগার্ড এবং ভলান্টিয়ার নিয়ে প্রায় ১৫০ জন ছিলেন। তার মধ্যে ৫০ জন অস্থায়ী হোমগার্ড ছিল। প্রথম কয়েক দিন চোরবাগানে এক ইনস্পেক্টর দায়িত্বে থাকলেও সেখানে ভিড়ের পরিস্থিতি দেখে দু’জন ডেপুটি কমিশনারকে পরে দায়িত্বে আনা হয়।
ধৃতের দাবি
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, শুক্রবার সকালে হেয়ার স্ট্রিট থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন চোরবাগান মণ্ডপের সেই ঘোষক কুশল। গ্রেফতারির পরেও তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক পোস্ট করা হয়েছে। হাতে লেখা একটি নোটে কুশল দাবি করেছেন, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্লাবে গিয়েছিলেন। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন গিরিশ পার্ক থানার ‘বড় বাবু এবং ছোট বাবু’। তাঁরা চা খাবেন বলায় তিনি এবং ক্লাবের অন্য এক সদস্য চা আনতে গিয়েছিলেন। তাঁদের চা দেওয়ার পরে ক্লাবে বসেই কিছু কাজ করছিলেন বলে লেখেন কুশল। ১০-১৫ মিনিট পরে একটি শব্দ শুনতে পান তাঁরা। তা শুনে থানার বড় বাবু এবং ছোট বাবু বেরিয়ে যান ক্লাবঘর থেকে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের ক্লাবের সম্পাদকের পুত্র কবির এসে বলে, ‘মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে’। সেই সময় আমি যখন বেরিয়ে যাব, তখন পুলিশের এক জন বলেন, আপনারা মাইকিং করুন। আমি সামনে গিয়ে দেখি, যে মাইকিং করছিল, সে নেই।’’ কুশল দাবি করেছেন, তার পর ‘বাধ্য হয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও’ তিনি মাইকে ঘোষণা করেন।
ফরেন্সিক দল
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশ ছ’সদস্যের সিট গঠন করেছে। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে ওই দল তদন্ত শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে তারা আবার এক বার চোরবাগানের ওই মণ্ডপে যায়। ঘুরে দেখে গোটা মণ্ডপ। আগেও এই দল চোরবাগানে গিয়েছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার পাশাপাশি, শনিবার ওই সময়ে মণ্ডপে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে শুরু করে ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার ঘটনাক্রম পুনর্নির্মাণ করেছিল সিট। সিটের পর ফরেনসিক দলও ঘটনাস্থলে যায়। অতীতে ওই মণ্ডপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা। বৃহস্পতিবার গোটা মণ্ডপ এবং আশপাশের অংশের ছবি থ্রিডি ক্যামেরায় তুলে নেন তাঁরা। ভবিষ্যতে ওই থ্রিডি স্ক্যানের ফুটেজ দেখে ঘটনাস্থল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ফরেনসিক সূত্রে খবর, যদি ভবিষ্যতে ওই মণ্ডপ ভেঙে দেওয়া হয়, তবে তার আসল ছবিটা হারিয়ে যাবে। মণ্ডপ ভেঙে ফেলার আগে প্রয়োজনীয় যাবতীয় নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন, যা পরবর্তী কালে তদন্তে সাহায্য করবে। যদিও রাজ্যের গড়া সিটের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানান, প্রতিমা নিরঞ্জনে কোনও বাধা নেই। কিন্তু মণ্ডপ হুবহু একই থাকবে।
