ময়মনসিংহ মেডিকেলের অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী বর্জ্য সংরক্ষণাগারে, সমালোচনার ঝড়
শেখ মহিউদ্দীনপ্রকাশ:
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে নগরের শম্ভুগঞ্জের একটি বর্জ্য সংরক্ষণাগারে। এসব চিকিৎসাসামগ্রীর মেয়াদ শেষ হতে এখনো দুই থেকে পাঁচ বছর বাকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিসহ বিষয়টি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বর্জ্য বাছাইয়ের কাজে যুক্ত শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিনই বর্জ্যের সঙ্গে এসব চিকিৎসাসামগ্রী সেখানে আসে। কিছু সামগ্রী হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হয়, আর বাকিগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়। তবে হাসপাতালের ভেতর থেকে এসব সামগ্রী কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা মমেক হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন হাজারো রোগী। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে মেয়াদ থাকা সামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এটি শুধু সরকারি সম্পদের অপচয়ের বিষয় নয়, হাসপাতালের মজুত ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জের ওই বর্জ্য সংরক্ষণাগারে কয়েক বস্তা সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া গেছে। এসব সামগ্রীর গায়ে উল্লেখিত মেয়াদ অনুযায়ী, কিছু ২০২৮ সাল এবং কিছু ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। তারপরও কেন সেগুলো বর্জ্যের সঙ্গে হাসপাতালের বাইরে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত শ্রমিক জুবেদা খাতুনের ভাষ্য, এ কাজে মোট ১১ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন মমেক হাসপাতাল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। বাকি সাতজন শম্ভুগঞ্জের সংরক্ষণাগারে সেগুলো বাছাই করেন।
জুবেদা খাতুন বলেন, প্রতিদিন বর্জ্যের সঙ্গে নতুন সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন আসে। এসব সামগ্রী আলাদা বস্তায় রাখা হয়। ১০ থেকে ১২ দিন পর তিন থেকে চার বস্তা জমলে সেগুলো হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হয়। অবশিষ্ট সামগ্রী পাইকারি দরে বিক্রি করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরানোর সময় ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসাসামগ্রী কীভাবে সেগুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। হাসপাতালের মজুত থেকে ওয়ার্ডে সরবরাহ, অব্যবহৃত সামগ্রী ফেরত নেওয়া এবং বর্জ্য হিসেবে নিষ্পত্তি—প্রতিটি ধাপে হিসাব সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। সেই ব্যবস্থায় কোথাও ঘাটতি থাকলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক নেতারাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মমেক হাসপাতাল থেকে ৩৫ থেকে ৪০ ভ্যানগাড়ি বর্জ্য সরানো হয়। এসব বর্জ্য থেকে প্রতি সপ্তাহে তিন বস্তা বা তারও বেশি অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি চিকিৎসাসামগ্রী জনগণের অর্থে কেনা হয়। রোগীরা যখন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়েন, তখন মেয়াদ থাকা সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন বর্জ্যের স্তূপে পাওয়া যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব সামগ্রীর মজুত, সরবরাহ ও নিষ্পত্তির হিসাব জনসমক্ষে পরিষ্কার করা উচিত।
নগরের ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। কোনো অনিয়ম থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিতে হবে।’
নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন এ ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালের অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায় ও তদারকির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ঠিকাদার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর কর্মকর্তা ডা. ঝন্টু সরকার বলেন, অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছুটি শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে এ বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি। হাসপাতালের বাইরে এসব সামগ্রী কীভাবে যাচ্ছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
