মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর মাথা সুরক্ষায় হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু সড়কে চলাচল করা মোটরসাইকেল আরোহীদের মাথায় থাকা হেলমেটটি আদৌ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামের হেলমেট। কিছু হেলমেট দেখতে আকর্ষণীয়, দামেও সস্তা। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় মাথাকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো সক্ষমতা সেগুলোর রয়েছে কী না, তা যাচাই করছেন না অনেক ক্রেতা।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশে ১৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। আর বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ওই একই মাসে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে শুধুমাত্র ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত ও ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
বিআরটিএ’র তথ্য বলছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৫০ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৮টি। আর রাজধানী শহর ঢাকাতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা রয়েছে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৪৯৭টি। রাইড শেয়ারিং প্রথা চালুর পর থেকে এই মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে।
এই দুই চাকার বাহনে যেখানে প্রতিমাসে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি থাকে, সেখানে এর চালক ও আরোহীরা নিরাপত্তা কতটুকু গ্রহণ করেন, সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিশেষজ্ঞ থেকে সবার। সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ভালোমানের একটি হেলমেট ব্যবহার করলে আরহী ৭৪ শতাংশ মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে পারে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় আমদানি করা হেলমেটের মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত ছয় মাসে সংস্থাটির পরীক্ষাগারে ৪৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি ১২টি হেলমেট। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনার প্রায় প্রতি চারটির একটিতে গুণগত মানের ঘাটতি পাওয়া গেছে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব সামনে এলেও বাজারে নিম্নমানের হেলমেটের উপস্থিতি, ক্রেতাদের অসচেতনতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
১৫০ টাকার হেলমেটও বিক্রি হচ্ছে বাজারে
ঢাকার বাজারে মোটরসাইকেলের হেলমেট বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাজার ঘুরে দেখা ও বিভিন্ন বিক্রয়তথ্য অনুযায়ী, ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার হেলমেটের পাশাপাশি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে কম দামের হেলমেট পাওয়া যায়। ভেগা, স্টিলবার্ড, স্টাডস ও গ্লাইডার্সের মতো ব্র্যান্ডের হেলমেটের দাম সাধারণত ১ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, উন্নত মানের বিদেশি ব্র্যান্ডের হেলমেটের দাম ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছু একজন হেলমেট দোকানী ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারে ১৫০ টাকা থেকেই হেলমেট পাওয়া যায়। এগুলো আসলে হেলমেট না, আমরা ‘প্লাস্টিকের টুপি’ বলে থাকি। এটির বাইরে থাকে ক্যাপের মতো প্লাস্টিকের আবরণ ও ভেতরে পাতলা কাপড়ের আস্তরণ।
তিনি আরও বলেন, এগুলো রাইড শেয়ারিং চালকরা বেশি কিনে থাকে। এগুলো হাত দিয়ে জোরে চাপ দিলেই ভেঙে যায়। এছাড়া বাজারে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার হেলমেট কেনার ক্রেতাও আছে বেশ। এগুলো অনেকটা শক্তপোক্ত। এগুলোর চাহিদাও বেশ।
রাইড শেয়ারিং চালক রাশেদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের একটা হেলমেট একটু ভালো থাকলেও পেসেঞ্জার হেলমেট অতোটা ভালো থাকে না। কারণ, বাইকে হেলমেট রাখার জায়গা নাই। ময়লা হয়ে যায়, চুরি হয়ে যায়। আর যাত্রীরাও তেমন একটা পড়তে চান না। পুলিশের মামলার ভয়েই রাখতে হয় হেলমেট।
মোটরসাইকেল আরোহীদের ব্যবহারের হেলমেট বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান ও নিরাপত্তা পরীক্ষার বিধান রয়েছে। আমদানি করা হেলমেটের নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রযোজ্য সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় শুধু হেলমেটের বাইরের গঠন দেখা হয় না। দুর্ঘটনার সময় আঘাত কতটা শোষণ করতে পারে, শক্ত বা ধারালো বস্তু হেলমেট ভেদ করে মাথায় পৌঁছাতে পারে কি না, মাথায় আটকে রাখার ফিতা কতটা কার্যকর— এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি তাপমাত্রা, পানি ও অন্যান্য পরিবেশগত পরিস্থিতিতে হেলমেটের সক্ষমতাও যাচাই করা হয়।
মানসম্মত হেলমেট কতটা জীবন বাঁচায়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের ‘হেলমেটস : অ্যা রোড সেফটি ম্যানুয়াল ফর ডিসিশন-মেকার্স অ্যান্ড প্র্যাকটিশনার্স’ শীর্ষক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নিরাপদ ও মানসম্মত হেলমেট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ছয় গুণেরও বেশি কমায় এবং মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমায়। এ ছাড়া ২০০৮ সালে ‘ককরেন ডেটাবেজ অব সিস্টেমেটিক রিভিউস’-এ প্রকাশিত ৬১টি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হেলমেট ব্যবহার মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ এবং মাথায় আঘাতের ঝুঁকি ৬৯ শতাংশ কমাতে পারে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এড়ানো সব সময় সম্ভব না হলেও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তাই মোটরসাইকেল চালকদের জন্য মানসম্মত হেলমেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের সময় অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রীও ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। অনেক অভিভাবক নিজেরা হেলমেট ব্যবহার করলেও মোটরসাইকেলে সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সময় তার জন্য হেলমেটের ব্যবস্থা করেন না। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মোটরসাইকেলে চালকসহ প্রত্যেক আরোহীর জন্য আলাদা মানসম্মত হেলমেট থাকা জরুরি। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেরই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের প্রচলন তেমন ছিল না। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এখন চালকদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা ইতিবাচক দিক। তবে এখনো অনেকে পুলিশের মামলা এড়াতে কম দামের হেলমেট ব্যবহার করেন, যেগুলো নিরাপদ নয়।
তিনি বলেন, হেলমেটের মান নিশ্চিত করতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। আমার জানা মতে, এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনুমোদন দেওয়া হলে বিএসটিআই অনুমোদিত হেলমেট ছাড়া অন্য হেলমেটের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। বর্তমানে অনুমোদন চূড়ান্ত না হওয়ায় বিষয়টি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এমএইচএন/এসএম
