পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষক রয়েছেন। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর প্রদেশজুড়ে স্কুল ভবনের নিরাপত্তা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং স্কুলটির মালিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পেশোয়ারের দির কলোনি এলাকার আল-খায়ের স্কুলে ক্লাস চলাকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাদ ধসে বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চালান। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিহত শিশুদের অধিকাংশের বয়স ১৩ বছরের নিচে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার প্রদেশের স্কুল ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি স্কুল ভবন পরিদর্শনের জন্য প্রাদেশিক যোগাযোগ ও পূর্ত বিভাগকে প্রতিটি জেলায় কারিগরি দল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব দল জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবনগুলোর অবস্থা মূল্যায়ন করবে।
পাকিস্তান টুডে ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি স্কুলগুলোর ছাদ, দেয়াল, ভিত্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশ পরীক্ষা করে জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন জমার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত।
অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি স্কুলগুলোর ভবন পরিদর্শনের জন্যও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব কমিটি ভবনগুলো নিরাপদ, মেরামতযোগ্য নাকি ঝুঁকিপূর্ণ—তা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে।
এপি ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে নিহত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন স্বজনের বক্তব্য উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, স্কুল ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ত এবং ভবনের কাঠামোগত অবস্থা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। স্বজনদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁরা ভবনের সমস্যা সম্পর্কে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন।
পেশোয়ারের পুলিশপ্রধানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে এপি জানিয়েছে, ভবনটি কাঠামোগতভাবে দুর্বল ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলমালিক মোহাম্মদ খান সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে ছাদ দুর্বল হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে ভবনের ত্রুটি, সম্ভাব্য অবহেলা এবং বৃষ্টির প্রভাব—দুর্ঘটনার পেছনে কোন বিষয় কতটা দায়ী, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে। প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি পাকিস্তানের সরকারি ও বেসরকারি সব স্কুলে ভবন নিরাপত্তার মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। আহত শিশু ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
পেশোয়ারের এ দুর্ঘটনা পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা তদারকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবনে কিংবা পর্যাপ্ত কারিগরি যাচাই ছাড়া পরিচালিত স্কুলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দ্রুত সংস্কার এবং প্রয়োজনে পাঠদান বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের ফল প্রকাশ ও দায় নির্ধারণের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্কুলের ছাদ ধসে এতগুলো শিশুর প্রাণহানির ঘটনা শুধু একটি ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না; বরং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ও তদারকি কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
The post পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে ৩৫ জনের মৃত্যু, নিরাপত্তা যাচাইয়ের নির্দেশ appeared first on ভোরের চেতনা.
