রোদেলা কলেজের ভেতরে যায়নি, বাসেও ওঠেনি। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রোদেলার চোখে আতঙ্ক। তার ভেতর অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সে তাকিয়ে আছে মেইন রোডের দিকে।
এসওএস চিলড্রেন ভিলেজ থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কলেজ বাস হারম্যান মেইনার কলেজের গেটে আসতেই ঘটনা শুরু হয়েছে। ছেলেমেয়েরা তখন বাস থেকে নামছিল। অমনি গুলির শব্দ। গুলির শব্দ এসেছে মেইন রোড থেকে।
বাস থেকে নেমে গুলির শব্দ শুনে কয়েকজন ছেলেমেয়ে দৌড়ে গেট দিয়ে কলেজে ঢুকে গেছে। কেউ কেউ রাস্তা থেকে আবার বাসে উঠে পড়ছে।
মোটর বাইকে দুজন ছিনতাইকারী ছিল। তাদের একজন রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারীর কাছ থেকে হাতের ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে চাইছে। তিনি ব্যাগ দিতে চাইছেন না। ব্যাগ নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। কয়েকজন মানুষ তাদের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। তখন মোটর বাইকে থাকা ছিনতাইকারী পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছে।
গুলির শব্দ পেয়ে রাস্তার লোকজন ছুটে দূরে সরে গেছেন। যার ব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করছিল তিনি ভয়ে ব্যাগ ছেড়ে দিয়েছেন। ব্যাগ এখন ছিনতাইকারীর হাতে। অটোরিকশাচালকরা আতঙ্কিত হয়ে রাস্তার ওপর রিকশা রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেছে। রাস্তায় এলোপাথাড়ি রিকশাগুলো পড়ে আছে। মোটর বাইক নিয়ে ছিনতাইকারীরা সেখান থেকে বেরুতে পারছে না। রাস্তার ওপর তাদের চারদিকে জ্যাম বাঁধিয়ে জটপাকানো অবস্থায় এলোমেলো থেমে আছে অটোরিকশা।
ব্যাগ হারিয়ে সেই নারী চিৎকার করে কাঁদছেন। ব্যাগ ফিরিয়ে নিতে তিনি ছিনতাইকারীর হাত থেকে ব্যাগ ধরে টান দিয়েছেন। যার কাছে পিস্তল সে ঠেলা দিয়ে রাস্তার ওপর থেকে অটোরিকশা সরানোর চেষ্টা করছে। বাইক নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জায়গা করা দরকার। ঠেলা দিয়ে অটোরিকশার জট ছাড়ানো যাচ্ছে না।
ব্যাগ ধরে সেই নারী টানাটানি করে যাচ্ছেন। ছিনতাইকারী তাকে জোরে ধাক্কা দিয়েছে। তিনি ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে গেছেন।
তখন লাফিয়ে এসেছে ছেলেটি। দড়ির মতো পাকানো ছিমছাম সরু দেহ। তমাল গাছের মতো ঘন কালো গায়ের রং। চোখ দিয়ে মনে হচ্ছে আগুন বের হচ্ছে। রোদেলার মনে হলো, এই ছেলে তার থেকে বছর দুয়েকের ছোট হবে। রোদেলা হারম্যান মেইনার কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। সে থাকে এসওএস চিল্ড্রেন ভিলেজে।
ছেলেটি আচমকা হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছিনতাইকারীর কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে নিয়েছে। তাল সামলাতে না পেরে ছিনতাইকারী হুমড়ি খেয়ে রাস্তার ওপর পড়ে গেছে। তখন আরেকজন ছিনতাইকারী দ্বিতীয় গুলি করেছে। ছেলেটির গায়ের শার্টের হাতার কাছে খানিকটা ছিঁড়ে নিয়ে গুলি বের হয়ে গেছে।
রোদেলা মেইন রোডের দিকে দৌড়াচ্ছে। বাসের ভেতর থেকে ভিলেজ সুপারভাইজার চিৎকার করে রোদেলাকে ডাকছেন। রোদেলা ততক্ষণে মেইন রোডে ছেলেটির কাছে চলে গেছে।
ঘটনা ঘটেছে অতিদ্রুত। রাস্তা থেকে রিকশা সরিয়ে খানিকটা জায়গা ফাঁকা করা সম্ভব হয়েছে। রাস্তায় পড়ে থাকা ছিনতাইকারী উঠে লাফ দিয়ে মোটর বাইকে বসেছে। তারা মোটর বাইক চালিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেছে।
ছেলেটির হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। শার্টের হাতা রক্তে ভিজে গেছে। ছেলেটি যার ব্যাগ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। রোদেলা ছুটে গিয়ে অমনি ছেলেটির হাত আঁকড়ে ধরল। হাতের যেখান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে সেই জায়গা চেপে ধরে রক্ত পড়া বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
রাস্তার দুপাশ থেকে লোকজন এগিয়ে আসছে। কলেজ বাস থেকে ভিলেজ সুপারভাইজার আর কয়েকজন ছেলেমেয়ে নেমে এসেছে। রোদেলা ওই অবস্থায় ছেলেটির হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে রাস্তার পাশের ফার্মেসিতে নিয়ে গেল। কনুইয়ের ওপর হাতের মাংস খুবলে নিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে।
পরদিন কলেজের সামনে বাস থেকে নামতেই রোদেলা দেখে ছেলেটি ফুটপাতে দাঁড়ানো।তাকে দেখে কেন জানি মনে হলো তার জন্যেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। রোদেলা এগিয়ে গেল।
ছেলেটি বলল, "গতকাল আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। ধন্যবাদ দিতে এসেছি।"
রোদেলা বলল, "আজ কেমন আছ তুমি? তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট হবে মনে হচ্ছে তাই তুমি বলছি। অন্তত বয়সে আমার সমান হলেও আপনি করে বলতাম।"
ছেলেটি হাসছে। তাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। তার হাসি সুন্দর। হাসলে তাকে আরও বেশি সুন্দর দেখায়। সে বলল, "ভালো আছি। তবে খুব ব্যথা করছে। হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বললেন হাড়ে লাগেনি। তাও সারতে সময় লাগবে।"
কলেজে ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা বাস থেকে নেমে হইহই করতে করতে কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকছে। রোদেলা খানিক পরে যাবে। সামনে তাকিয়ে বলল, "তোমার নাম কী? কী করো? থাকো কোথায়?"
ছেলেটি বলল, "আমার নাম ফরিদ। আমরা তিন ভাইবোন। আমার ছোট দুই বোন আছে। একজনের বয়স দশ বছর, আরেকজন আরও ছোট। তার বয়স ছয় বছর।"
রোদেলা বলল, "কী করো তুমি?"
ফরিদ বলল, "বিআরটিএতে দালালি করি। মানুষজনের গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট বানিয়ে দিই।"
বাস থেকে নেমে সবাই কলেজে ঢুকে গেছে। ভিলেজ সুপারভাইজার রোদেলাকে ডাকছেন। ফরিদের দিকে তাকিয়ে রোদেলা জিজ্ঞেস করল, "তোমরা থাকো কোথায়?"
দীপু
ফরিদ বলল, "এই মিরপুর দশ নম্বরের ওভারব্রিজের নিচে।"
ভিলেজ সুপারভাইজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রোদেলাকে যেতে বলছেন। ফরিদের চোখের দিকে তাকিয়ে রোদেলা বলল, "তুমি খুব সাহসী ছেলে। গ্রেট হিরো।"
ফরিদ আবার সুন্দর করে হেসেছে। তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে।
ফরিদের ছোট বোনের বয়স যখন দুই বছর তখন বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। গত বছর এক সকালে ঘুম থেকে জেগে তিন ভাইবোন দেখে মা নেই। তাদের মা আর ফিরে আসেনি। সেই থেকে দুই বোনকে নিয়ে ফরিদ মিরপুর দশের ওভারব্রিজের নিচে পলিথিন দিয়ে ছাপড়া বানিয়ে থাকে।
রোদেলার বাস এসে কলেজের সামনে থামলেই ফুটপাতে প্রাচীরের পাশে ফরিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। রোদেলা বাস থেকে নেমে হাত নেড়ে জোরে বলল, "কী ফরিদ, আজ কাজ নেই তোমার!"
লজ্জামুখে হেসে ফরিদ বলল, "আছে। এখুনি যাব।"
রোদেলা গেট পেরিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে গেলে ফরিদ কাজে চলে গেল। সে আবার পরদিন কলেজের সামনে এসেছে যখন বাস এসে দাঁড়িয়েছে।
বাস থেকে রোদেলা নেমে আসছে। ফরিদ এগিয়ে গেল বাসের কাছে। রোদেলা থমকে দাঁড়িয়েছে। ফরিদ বলল, "আপনাকে একটা কথা বলার জন্য এসেছি। আনন্দের কথা।"
রোদেলা কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কিছু বলেনি। চুপ করে আছে। ফরিদ বলল, "আপনি প্রতিদিন কলেজে আসেন, দেখে আমার ভালো লাগে। বেশি ভালো লাগে।"
ফরিদ আর কিছু বলছে না। রোদেলাও কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেমেয়েরা বাস থেকে নেমে কলেজে ঢুকছে। তাকে ডাকছে।
ফরিদ বলল, "মিরপুর চোদ্দ নম্বরে একটা ইশকুল আছে। বিকালে পড়ায়। আমি সেই ইশকুলে ভর্তি হয়েছি। পড়াশোনা করছি।"
ফরিদ হাসছে। তার মুখভরা লজ্জা। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রোদেলা বলল, "তোমার মতো সাহসী ছেলে আমি আর একজনও দেখিনি। তুমি খুব ভালো পড়াশোনা করবে। কোনো দরকার হলে আমাকে বলবে।"
ফরিদ মাথা তুলে আস্তে করে বলল, "আচ্ছা।"
রোদেলা গেট পেরিয়ে কলেজের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ফরিদ সেদিকে তাকিয়ে আছে। তার তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে।
তারপর দুদিন কলেজ ছুটি ছিল। কলেজ খোলার দিন রোদেলা ভেবেছিল ফরিদ কলেজ গেটের কাছে থাকবে। ফরিদ কলেজ গেটের কাছে ছিল না। রোদেলা বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে ফরিদকে খুঁজল। ফরিদ কোথাও নেই।
তার পরের দিনও ফরিদকে দেখা গেল না। তার পরের দিনও না। বুধবার টিফিন পিরিয়ডে কাউকে কিছু না বলে রোদেলা কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়ল।
রোদেলাকে দেখে ফরিদ ভীষণ অবাক হয়েছে। বিস্মিত গলায় বলল, "আপনি কীভাবে চিনলেন আমরা এখানে আছি!"
রোদেলা বলল, "তোমাদের একটা ঠিকানা আছে। আর সেই ঠিকানা তুমি আমাকে বলেছিলে। তোমাকে আর দেখি না কেন?"
ফরিদ বলল, "চারদিন হলো মিনুর খুব জ্বর। মিনু আমার ছোট বোন। তাকে রেখে কোথাও যেতে পারি না।"
রোদেলা পলিথিন সরিয়ে ঝুপড়ির ভেতর ঢুকেছে। স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে লিকলিকে শরীরের একজন মেয়ে শুয়ে আছে। তার পাশে আরেকজন মেয়ে বসে আছে। রোদেলা বুঝেছে এরা দুজন ফরিদের ছোট বোন।
মিনুর কপালে হাত দিয়ে রোদেলা চমকে উঠেছে। অনেক জ্বর। তাদের সাথে নিয়ে পাশের ফার্মেসিতে গেছে। সেখানে ডাক্তার নেই। তবে ফার্মেসিতে যিনি ছিলেন তিনি ওষুধ দিয়েছেন।
রোদেলার কাছে অল্প কিছু টাকা ছিল। সে সেই টাকা ফরিদকে দিয়ে এসেছে।
এসওএস চিল্ড্রেন ভিলেজের ডিরেক্টর গম্ভীর মুখে বসে আছেন। রোদেলাকে ডেকে আনা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক আর রোদেলার হাউস মা সেখানে আছে। রোদেলার ভয় পাওয়ার কথা। তার ভয় লাগছে না।
ডিরেক্টর বললেন, "তুমি যে অন্যায় করেছ সেটা বুঝতে পারছ?"
রোদেলা বলল, "স্যার, সব শাস্তি আমি মেনে নেব। ফরিদের দুই বোনকে আমাদের ভিলেজে রাখার ব্যবস্থা করেন।"
শীতল গলায় ডিরেক্টর বললেন, এখানে ছেলেমেয়ে থাকার সিস্টেম আছে। তুমি এসে বললেই তো দুজন মেয়েকে হুট করে রাস্তা থেকে তুলে এনে আমাদের ভিলেজে রাখতে পারি না।"
বিনয় আর তেজ মেশানো গলায় রোদেলা বলল, "সিস্টেম বানিয়ে নিন। আপনি আছেন, ন্যাশনাল ডিরেক্টর স্যার আছেন। প্রজেক্ট ডিরেক্টর ম্যাডাম আছেন। আপনারা একসাথে সিস্টেম বানান।"
ডিরেক্টরের উদ্যোগে ফরিদের দুই বোনকে এসওএস চিল্ড্রেন ভিলেজে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা এখানেই আছে। ভালো আছে।
কলেজ বাস থেকে নেমে রোদেলার চোখ আচমকা আটকে গেল। ঝকঝকে ধবধবে প্যান্ট শার্ট পরে ফুটপাতে প্রাচীরের পাশে ফরিদ দাঁড়িয়ে আছে। রোদেলা এগিয়ে গেল তার কাছে।
ফরিদ বলল, আপা, ওস্তাদের কাছে অটোমোবাইলের কাজ শিখছি। ইশকুলের স্যার বলেছেন আমার ব্রেন ভালো। আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব।"
রোদেলা বলল, "ভালোভাবে পড়াশোনা করো। তোমাকে শিগগিরই আমাদের ভকেশনাল ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেব। তুমি হবে বিশাল ইঞ্জিনিয়ার।"
ফরিদ হাসছে। সেই লাজুক হাসি। তাকে আজ যেন সব দিনের থেকে আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
