ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া যাওয়া বাংলাদেশিরা। কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও সম্প্রতি ইউক্রেনের সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরেছেন ঝিনাইদহের তরুণ রাজন হোসেন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সংবাদসংস্থা বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা।
রাজন হোসেনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায়। তিনি বলেন, গত মে মাসে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে ট্রাভেল এজেন্সি জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল তাকে রাশিয়া পাঠায়।
কিন্তু রাশিয়া পৌঁছানোর পর আমার পাসপোর্ট, ফোন -সবকিছু কেড়ে নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর প্রথমে তাকে নেওয়া হয় রুশ বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সেখানে তিন সপ্তাহ রেখে অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর সরাসরি পাঠানো হয় ইউক্রেনে, সম্মুখসারির যুদ্ধে। আমার সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২৯ জনকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমদিনেই ইউক্রেনের সৈন্যদের ড্রোনের হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে আরও তিনজন মিলে আমাদের গ্রুপে মোট ২০ জন মারা গেছে।
ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে পাঠানোর দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন বাংলাদেশের ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন। কোমর ও দুই পা অবশ হয়ে যাওয়ার পরও চার দিন ধরে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হাত ও বুকের ভর দিয়ে পাড়ি দিয়ে রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি। তবে সেখানে চিকিৎসার বদলে অস্ত্র হারানোর অভিযোগে মারধরের শিকার হন। পরে ক্যাম্পের অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানতে পারেন, ইউক্রেনীয় সৈন্যদের অবস্থান শনাক্ত করতে রুশ বাহিনী তাদের ‘টোপ’ বা ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। কয়েক সপ্তাহ রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় আগস্টের শেষ দিকে দেশে ফেরার সুযোগ পায়।
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১০)। এ ঘটনায় রাজন হোসেন ও তাঁর পরিবার দেশে ফেরার পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর পরই তদন্ত শুরু করে এসআরবি। তদন্তে উঠে এসেছে, জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি এজেন্সি কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসব বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠায়। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়। তদন্তে চক্রটির সঙ্গে ইগর নামে এক রুশ নাগরিক ও জুলিয়া নামে কিরগিজস্তানের এক নারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রের মূল হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ২০। নিহতদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। উন্নত জীবনের আশায় তাঁদের অনেকে জমি ও গবাদিপশু বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, গত এক বছরে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং পরে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে তিন ডজনের বেশি আবেদন পেয়েছেন তাঁরা। রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে খোঁজ চলছে। তবে আগে নিহত ছয়জনের মরদেহই এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় সম্প্রতি নিহত বলে শনাক্ত হওয়া আরও ২০ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তাদের স্বজনেরা। আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
